কিন্তু বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে যত কম থাকে ততই ভালো কি কম থাকার কথা বলা হয়েছে? সেই বিষয়গুলিকে পরিস্ফুট কর | বাংলা ভাষার বিজ্ঞান বিজ্ঞান | দশম শ্রেণী
প্রশ্ন: 'কিন্তু বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে যত কম থাকে ততই ভালো—কী কম থাকার কথা বলা হয়েছে? সেই বিষয়গুলিকে পরিস্ফুট করো।
উত্তর > কম থাকা বিষয়: সাহিত্যে লক্ষণা, ব্যঞ্জনা, উৎপ্রেক্ষা, সমাসোক্তি প্রভৃতি অলংকারের প্রয়োগ ঘটলেও, প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসুর মতে বিজ্ঞান-বিষয়ক সাহিত্যের ব্যবহার কম হওয়া উচিত।
শব্দের ত্রিবিধ শক্তি: ভারতীয় আলংকারিকগণ শব্দের শক্তিসমূহকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন, যথা—অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা। ‘অভিধা' শব্দের অর্থ হল নাম বা সংজ্ঞা। ‘লক্ষণা' হল শব্দের দ্বিতীয় শক্তি। মুখ্য অর্থের পরিবর্তে এই শক্তি দ্বারা শব্দের অন্য অর্থ প্রবল হয়ে ওঠে। যেমন, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি'-র অর্থ হল অরণ্যবাসীদের রোজনামচা।
‘ব্যঞ্জনা' কাব্যের নিগূঢ় অর্থপ্রকাশক বৃত্তি। অভিধা ও লক্ষণার দ্বারা যে-অর্থ বোঝানো সম্ভব হয় না, তা ব্যঞ্জনার দ্বারা বোঝানো হয়। যেমন, ‘অরণ্যে রোদন' কথার অর্থ হল 'নিষ্ফল আবেদন'।
বিভিন্ন অলংকার: পূর্বে উল্লিখিত ত্রিবিধ শক্তি ছাড়াও আলোচ্য অংশে লেখক রাজশেখর বসু উৎপ্রেক্ষা ও অতিশয়োক্তি অলংকারের কথা বলেছেন। উপমেয়কে উপমানরূপে ভুল করা হলে উৎপ্রেক্ষা অলংকার হয়। যেন, বুঝি ইত্যাদি শব্দ উৎপ্রেক্ষার দ্যোতক। উৎপ্রেক্ষা দু-প্রকার –বাচ্যোৎপ্রেক্ষা ও প্রতীয়মানোৎপ্রেক্ষা। অন্যদিকে অতিশয়োক্তি অলংকারে উপমেয়ের উল্লেখ মোটেই না-করে উপমানকেই উপমেয়রূপে নির্দেশ করা হয়। বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধের ক্ষেত্রে এইসব অলংকারের ব্যবহা কম হওয়াই উচিত।
প্রশ্ন : ‘এই কথাটি সকল লেখকেরই মনে রাখা উচিত।— কোন্ কথাটি মনে রাখা উচিত? লেখকদের কোন্ কোন্ ত্রুটির কথা প্রাবন্ধিক তুলে ধরেছেন?
উত্তর > মনে রাখার বিষয় ; প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যরচনায় ভাষার গুরুত্ব প্রসঙ্গে উক্তিটি করেছেন। তাঁর মতে, এ জাতীয় আলোচনার ভাষা সরল ও স্পষ্ট হওয়া উচিত। এ কথা লেখকদেরও মনে রাখা উচিত।
লেখকদের ভাষাসমস্যা : বাংলায় বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যরচনায় লেখকদের ভাষাসমস্যা অন্যতম অন্তরায়। এক্ষেত্রে উপযুক্ত লিখনশৈলী অনেক লেখক। আয়ত্ত করতে পারেননি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদের ভাষা আড়ষ্ট ও ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ হয়ে দাঁড়ায়। ইংরেজি শব্দের অর্থব্যাপ্তি বাংলা প্রতিশব্দে আনতে গিয়ে তারা নানা অদ্ভুত করেন।
লেখকদের ভাবনাচিন্তা : অনেক লেখক আছেন, যাঁরা তাঁদের বক্তব্যের বিষয়বস্তু ইংরেজিতে ভালো আর তার হুবহু অনুবাদের চেষ্টা করেন। তখন পাঠ বিষয় নীরস ও শুষ্ক হয়ে পড়ে।
পরিভাষা ব্যবহারে সমস্যা : পরিভাষাও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও লেখকদের কিছু সমস্যা থেকে গেছে। বিজ্ঞানভিত্তিক রচনায় পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে লেখাকে সহজবোধ্য করতে গিয়ে কিছু লেখা পরিভাষার মূল উদ্দেশ্য যে ভাষাসংক্ষেপ, তা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।
অলংকারের ব্যবহার: অলংকারের ক্ষেত্রে একমাত্র উপমা ও রূপক অলংকার চলতে পারে। তার মৌলিক ও উচ্চাঙ্গের বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ লিখতে গেলে অলংকারবর্জিত, সাবলীল, আক্ষরিক অনুবাদের ত্রুটিমুক্ত সহজসরল স্পষ্ট ভাষা লেখকদের অনুসরণ করা উচিত।
