সর্ব মনস্কামনা সিদ্ধ পর্ব ৪
সর্ব মনস্কামনা সিদ্ধ পর্ব ৪
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
ষট্কর্ম
তন্ত্রের প্রধান স্থান অধিকার করে আছে ষট্কর্ম । তন্ত্রে যে ষট্কর্ম অর্থাৎ ছয়টি কর্ম আছে, তাকেই ষট্কর্ম বলা হয়। তন্ত্রে বলা হয়েছে—
শান্তি বশ্যস্তম্ভনানি বিদ্বেষোচ্চাটনে ততঃ।
মারণাস্তানি শংসন্তি ষট্কর্মাণি মনীষিণঃ ॥
অর্থাৎ শান্তিকর্ম, বশীকরণ, স্তম্ভন, বিদ্বেষণ, উচ্চাটন এবং মারণ। এই ছয়টি তন্ত্রোক্ত ক্রিয়াকে ষট্কর্ম বলা হয়।
কোন কর্মে কি হয়।
রোগকৃত্য গ্রহাদীনাং নিরাসঃ শান্তিরীরিতা।
বশ্য জনানাং সর্বেষাং বিধেয়ত্বমুদীরিতম্।।
প্রবৃত্তিরোধঃ সর্বেষাং স্তম্ভনং তদুদীরিতম্।
স্নিগ্ধানাং দ্বেষজননং মিথো বিদ্বেষণ মতম্ ।।
উচ্চাটনং স্বদেশাদেভ্রংশমং পরিকীর্তিতম্।
প্রাণিনাং প্রাণহরণং মারণং তদুদাহৃতম্ ।
স্বদেবতা দিক্ কালাদীন্ জ্ঞাত্বা কর্মাণি সাধয়েৎ ।।
অর্থাৎ, যে কার্যের সাহায্যে রোগ-ব্যাধি, কুকর্মের ফলাদি, গ্রহদোষ প্রভৃতি শান্ত হয়, তাকে শান্তিকর্ম বলে। যে কার্যের দ্বারা সর্বজনকে বশ করা যায়, তাকে বশীকরণ বলা হয়। যে তান্ত্রিক ক্রিয়ার সাহায্যে সকলের প্রবৃত্তি রোধ করা যায়, তাকে স্তম্ভন বলা হয়। যে তান্ত্রিক ক্রিয়ার দ্বারা পরস্পরের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা যায়, তার নাম বিদ্বেষণ। যে কার্যের সাহায্যে কোন প্রাণীর প্রাণনাশ করা হয়, তাকে মারণ বলে। তন্ত্রে উপরোক্ত ছয়টি প্রধান কার্যের কথা বলা হয়েছে। তবে এই সকল কর্মের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, ঋতু অর্থাৎ সময়, কাল, দিক, আসন, মুদ্রা, তত্ত্ববিচার, মন্ত্রবীজ,
পদ যোজনা এবং সাধনে কর্তব্য পৃথক। এখানে বিস্তারিতভাবে তন্ত্রোক্ত মত উল্লেখ করা হলো।
ষটুকর্মের দেবতা
রতির্বাণী রমা জ্যেষ্ঠা দুর্গা কালী যথাক্রমম্।
ষট্কর্মাঃ দেবতাঃ প্রোক্তাঃ কৰ্মাদৌ তাং প্রপূজয়েৎ ৷৷
অর্থাৎ, রতি, বাণী, রমা, জ্যেষ্ঠা, দুর্গা ও কালী হলেন ষট্কর্মের দেবতা। তাঁহার মধ্যে রতি হলেন শান্তি কর্মের দেবতা, বাণী হলেন বশীকরণের দেবতা, রমা হলেন স্তম্ভনের দেবতা, জ্যেষ্ঠা হলেন বিদ্বেষণের দেবতা, দুর্গা হলেন উচ্চাটনের দেবতা এবং কালী হলেন মারণ কর্মের দেবতা। যে যে কার্য্যে যে সমস্ত দেবীর কথা বলা হয়েছে, সেই সব কার্য্যে সেই সেই দেবীর পূজার্চনা করতে হয় প্রথমে।
ষট্কর্মের কাল বা ঋতু হেমন্তঃ শান্তিকে প্রোক্ত বসন্তো বশ্যকর্মণি ।
শিশিরঃ স্তম্ভনে জ্ঞেয়ো বিদ্বেষে গ্রীষ্ম ঈরিতঃ ।।
অর্থাৎ, হেমন্তকালে —শান্তিকর্ম। বসন্তে— বশীকরণ। শীতে স্তম্ভনকার্য।
গ্রীষ্মে বিদ্বেষণ। বর্ষায়—উচ্চাটন। শরতে মারণকার্য প্রশস্ত।
কিন্তু গ্রীষ্মকালে যদি শান্তিকর্মের বিশেষ আবশ্যক হয়, সে ক্ষেত্রে কি কি করা যাবে তন্ত্রে এই সমস্যারও সমাধান করা হয়েছে। তন্ত্রে বলা হয়েছে – সারাদিনের মধ্যেই ষড়ঋতুর আবির্ভাব হয়। যথা--
সূর্যোদয়ং সমারভ্য ঘটিকাদশকং ক্রমাৎ।
ঋতবঃ সুর্বসস্তাদ্যা অহোরাত্রং দিনে দিনে।
বসন্ত-গ্রীষ্ম-বর্ষাস্থ্য শরদ্ধেমন্ত শিশিরাঃ ।।
অর্থাৎ, সূর্যোদয় থেকে প্রতি দশ দণ্ডে এক-একটি ঋতুর কল্পনা করা হয়েছে তন্ত্রে।
যেমন—-সূর্যোদয় থেকে প্রথম দশ দণ্ড-
দণ্ড বর্ষা। চতুর্থ দশ দণ্ড——শরৎ। পঞ্চম দশ দণ্ড---হেমন্ত। ষষ্ঠ দশ দণ্ড—শীতঋতু।
—বসন্ত। দ্বিতীয় দশ দণ্ড —গ্রীষ্ম। তৃতীয় দশ
মতান্তরে
অর্ধরাত্রং শরৎকালো হেমন্তশ্চ প্রভাতকঃ ।
পূর্বাহ্নে বসন্তশ্চৈব স্যান্মধ্যাহ্নে গ্রীষ্ম এব চ।
প্রাবৃরূপোহরাহ্ন স্যাৎ প্রদোষঃ শিশির স্মৃতঃ ।
পাতা ৫১
মতান্তরে আবার বলা হয়েছে—রাত্রির অর্থভাগ শরৎ। প্রভাত-হেমন্ত।
পূর্বাহ্ন—বসন্ত। মধ্যাহ্ন গ্রীষ্ম। অপরাহ্ন – বর্ষা। প্রদোষ বা সন্ধ্যা—শীত ঋতু।
ষট্কর্মের দিক নির্ণয়
জপেৎ পূর্বমুখো বশ্যে দক্ষিণঞ্চাভিচারকে ।
পশ্চিমে স্তম্ভনং বিদ্যাদুত্তরং শান্তিকং ভবেৎ ।।
আকর্ষণমথাগ্নেয্যাং নৈর্ঝতে মারণং তথা।
উচ্চাটনস্তু বায়ব্যে ঐশান্যাং মোক্ষদায়কম্।
তথাভিসারে কার্য্যা চ দক্ষিণাপ্লাবনা মহী। — চামুণ্ডা তন্ত্র।
অর্থাৎ, উত্তরমুখে — শান্তিকর্ম। পূর্বমুখে—বশীকরণ। পশ্চিমমুখে—স্তম্ভন। দক্ষিণমুখে—বিদ্বেষণ। উচ্চাটন—বায়ুকোণে এবং মারণকর্ম -- নৈর্ঘাতমুখে করার নির্দেশ দিয়েছেন তন্ত্র। ঈশাণকোণাভিমুখে জপ করলে সাধক মোক্ষলাভ করে।
ষট্কর্মের আসন
আসন সম্পর্কে এখানে দেহভঙ্গির কথা বলা হয়েছে। এগুলি যৌগিক আসনের অন্তর্গত। তন্ত্রে বলা হয়েছে—
পদ্মাখ্যং স্বস্তিকং ভুয়ো বিকটং কুক্কুটং পুনঃ।
বজ্রং ভদ্রকমিত্য হরাসনানি মনীষিণঃ ।
অর্থাৎ, পদ্মাসন, স্বস্তিকাসন, বিকটাসন, কক্কুটাসন, বজ্রাসন ও ভদ্রাসন, এই ছয়টি
আসনের মধ্যে, শান্তিকর্মে—পদ্মাসন। বশীকরণে —— স্বস্তিকাসন। স্তম্ভনে—বিকটাসন।
বিদ্বেষণে—কক্কুটাসন। উচ্চাটনে বজ্রাসন এবং মারণে ভদ্রাসন প্রশস্ত।
ষটকর্মের মুদ্রা
ষট্মুদ্ৰা ক্ৰমতো জ্ঞেয়াঃ পদ্মপাশগদাহৃতা।
মুষলানি খড়গাখ্যাঃ শান্তিকাদিষু কর্মসু ৷৷
অর্থাৎ, পদ্ম, পাশ, গদা, মুষল, বজ্র এবং খড়গ। এই ছয়টি মুদ্রার মধ্যে শান্তিকর্মের,
পদ্মমুদ্রা, বশীকরণে—পাশমুদ্রা। স্তম্ভনে—গদামুদ্রা। বিদ্বেষণে—মুষল মুদ্রা। উচ্চাটনে—বজ্রমুদ্রা। মারণে—খড়ামুদ্রা প্রশস্ত।
পাতা ৫২
ষট্কর্মে তত্ববিচার
জলং শান্তিবিধৌ শন্তং বশ্যে বহ্নিরুদীরিতঃ।
স্তম্ভনে পৃথিবী শস্তা বিদ্বেষে ব্যোমকীর্তিতম্।।
উচ্চাটনে স্মৃতো বায়ুভূয়োঽগ্নির্মারণে স্মৃতঃ।
তত্ত্বভুতোদয়ে সম্যক্ তত্তন্মণ্ডল সংযুতম্।
তত্তৎকর্ম বিধাতব্যং মন্ত্রিণা নিশ্চিতাত্মনা ।।
অর্থাৎ, শান্তিকর্মে — জলতত্ব, বশীকরণে বহ্নিতত্ত্ব, স্তম্ভনে— পৃথ্বীতত্ত্ব, বিদ্বেষণে—আকাশতত্ব, উচ্চাটনে – বায়ুতত্ব এবং মারণ কর্মে বহ্নিতত্ব। প্রয়োগ করার তান্ত্রিক বিধি।
ষটকর্মের মন্ত্রবীজ
শীতাংশুসলিল ক্ষৌনী-ব্যোম-বায়ু হবির্ভুজাম্ ।।
বর্ণা স্যমন্ত্রবীজানি ষট্কর্মসু যথাক্রমম্।।
অর্থাৎ, ষটকর্মে নানাপ্রকার বীজমন্ত্রের ব্যবহারের নির্দেশ আছে। এর মধ্যে ঠং,বং,লং, হং, যং ও রং, এই মন্ত্রগুলি যথাক্রমে ষটকর্মে প্রয়োগদ্বারা কার্য্য সিদ্ধি হয়ে থাকে।
ষটকর্মের পদ যোজনা
উচ্চাটনে ‘বষট’ প্রোক্তং হুঁফড়ন্তঞ্চ মারণে।
স্তম্ভনে চ নমঃ প্রোক্তং স্বাহা শান্তিক পৌষ্টিকে ৷৷
হোম তর্পণয়োঃ স্বাহা ন্যাস পূজনয়োনমঃ।
মন্ত্রান্তে যোজয়েন্মন্ত্রী জপকালে যথাস্থিতি ।
অর্থাৎ, উচ্চাটন কর্মে মন্ত্রের শেষে বষট্। মারণ কর্মে — হুঁ ফট। স্মম্ভন কর্মে নমঃ। শান্তিকর্মে— স্বাহা। বিদ্বেষণে—–বৌষট্ পদ যোগ করবেন। হোম এবং তর্পণ কর্মে মন্ত্রের শেষে ‘স্বাহা” এবং ন্যাস ও পূজাতে‘নমঃ” শব্দ যোগ করবেন।
তা ছাড়া মন্ত্র উদ্দীপন কার্য্যেও 'বর্ষ' শব্দ
প্রয়োগ তন্ত্র সম্মত।
ষট্কর্ম সাধনে সাধকের কর্তব্য
এক লক্ষং জপেন্মন্ত্রং ধ্যান ন্যাস সমন্বিতঃ ।
প্রয়োগ দোষশান্তর্থং মাত্মরক্ষার্থ কারণম্ ।।
নচেৎ ফলঞ্চনাপ্নোতি দেবতাশাপমাপ্পুয়াৎ।
পাতা ৫৩
ন কুর্য্যাদ মারণং কর্ম কুর্য্যাচ্চেদযুতং জপেৎ ।
ততঃ প্রায়শ্চিত্ত পরিমিতি।। --কুমার্ণব তন্ত্র ।
অর্থাৎ, ষট্কর্ম সাধনের নিমিত্ত আদিতে যথাবিধি ধ্যান করে ১,০০০০০ (এক লক্ষ) মন্ত্র জপ করতে হবে। এই কার্য্যের দ্বারা প্রয়োগজনিত কোনও বাধা, দোষ
বা অনিষ্ট হয় না। প্রথমে একলক্ষ মন্ত্র জপ না করে ষট্কর্মে লিপ্ত হলে, সুফল লাভ অসম্ভব। উপরন্তু এই কাজে দেবতার অভিশাপ লাগে সাধককে। অন্যান্য তন্ত্রে যে অমৃত জপের কথা উল্লেখ আছে, প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তা জপ করতে হয়। সাধক যদি মারণকার্যে ব্রতী হয়, তার পূর্বে তাকে ১০,০০০ (দশ হাজার) প্রায়শ্চিত্ত মন্ত্র জপ করতে হবে।
_1.jpg)
_1.jpg)
_1.jpg)
_1.jpg)
_1.jpg)