ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা কর নবম শ্রেণীর ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায়
![]() |
প্রশ্ন: ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা করো।
উত্তর সংকেত : প্রথম অংশ : ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণ :
(১) ধর্মীয় কারণ, (২) বিপরীতমুখী স্বার্থ, (৩) ইংল্যান্ডের স্বার্থ, (৪) ফ্রান্সের উদ্দেশ্য প্রত্যক্ষ কারণ।
দ্বিতীয় অংশ :
ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ফলাফল : (১) প্রত্যক্ষ ফলাফল, (২) পরোক্ষ ফলাফল।
উত্তর> প্রথম অংশ : উনিশ শতকে বলকান অঞ্চল ইউরোপের রাজনীতিতে অশান্ত ঘূর্ণি সৃষ্টি করেছিল এবং ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (১৮৫৪-১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ) ছিল এই সংকটজনক পরিস্থিতির পরিণতি।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণ : মূলত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।
[১] ধর্মীয় কারণ : প্যালেস্টাইনের জেরুজালেমের গ্রোটো গির্জার কর্তৃত্ব ও পবিত্র স্থানের রক্ষণাবেক্ষণের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গ্রিক ও লাতিন-ক্যাথোলিক ধর্মযাজকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব গড়ে উঠেছিল। গ্রিক খ্রিস্টানদের পক্ষ নেয় রাশিয়া এবং ক্যাথোলিক খ্রিস্টানদের পক্ষ নেয় ফ্রান্স। এভাবে ধর্মীয় প্রশ্নের সঙ্গে বৃহৎ শক্তিধর দেশের বিবাদ যুক্ত হয়ে পড়েছিল। রাশিয়া গ্রিক ধর্মযাজকদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তুরস্ক আপত্তি জানায় এবং রাশিয়া যুদ্ধের পথে এগোয়।
[২] বিপরীতমুখী স্বার্থ : সমুদ্রপথে স্থায়ী পথ লাভের জন্য তুরস্কের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়া তুরস্ককে দখল করতে উদ্যোগী হয়। অন্যদিকে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন রাশিয়াকে পরাজিত করে স্বদেশে জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এই পরস্পরবিরোধী সংঘাতে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
[৩] ইংল্যান্ডের স্বার্থ : রাজনৈতিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক কারণে ইংল্যান্ড তুরস্ক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল এবং এই অঞ্চলে রাশিয়াকে ইংল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল।
[৪] ফ্রান্সের উদ্দেশ্য : ফ্রান্স ইউরোপীয় রাজনীতিতে নিজের হারানো মর্যাদাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডের পক্ষে অংশগ্রহণ করেছিল।
প্রত্যক্ষ কারণ : রাশিয়া মোলডাভিয়া ও ওয়ালাচিয়া প্রদেশ দুটি দখল করলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া প্রভৃতি দেশ ভিয়েনাতে মিলিত হয় এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব (ভিয়েনা নোট) গ্রহণ করে। রাশিয়া এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য।করলে তুরস্কের পক্ষে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যোগদান করে এবং ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হয়।
দ্বিতীয় অংশ :
ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ফলাফল :
প্রত্যক্ষ ফলাফল : প্রত্যক্ষ ফলাফলের দিক দিয়ে মনে হতে পারে যে, ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ছিল একটি নিষ্ফল ও অবাঞ্ছিত যুদ্ধ। ঐতিহাসিকরা এই যুদ্ধকে অনাবশ্যক ও অযৌক্তিক যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এই যুদ্ধের মাধ্যমে বলকান সমস্যার প্রকৃত সমাধান হয়নি।
পরোক্ষ ফলাফল : পরোক্ষ ফলাফলের গুরুত্ব বিচার করলে ক্রিমিয়ার যুদ্ধকে মোটেই অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক যুদ্ধ বলা চলে না। এই যুদ্ধের ফলেই—(১) বলকান অঞ্চলে রাশিয়ার আগ্রাসন বাধাপ্রাপ্ত হয়।
(২) যুদ্ধের ফলেই তুরস্কের আধুনিকীকরণ সম্ভব হয়।
(৩) এই যুদ্ধের পর বলকান জাতীয়তাবাদ ক্রমশ প্রবল হয়ে ওঠে এবং ইউরোপের দেশগুলির হস্তক্ষেপের ফলে সংকট ঘনীভূত হয়।
(৪) ইটালি ও জার্মানির ঐক্যসাধন এবং বলকান অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের অগ্রগতি সব কিছুই ক্রিমিয়ার যুদ্ধ দ্বারা বিশেষ প্রভাবিত হয়েছিল।
(৫) ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন মনে করেন, ক্রিমিয়ার যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত ফলাফল ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
(৬) বলকান অঞ্চলে তুরস্ক সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হলেও বলকান অঞ্চলে তুরস্কের কুশাসন সেখানে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
পরিণতি : ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। প্রায় ছয় লক্ষেরও বেশি সেনার জীবনহানি ঘটে। এ ছাড়া বহু সেনা আহত হন। এই সময়ে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল (১৮২০-১৯১০ খ্রিস্টাব্দ) নামে এক ব্রিটিশ নার্স যুদ্ধক্ষেত্রে নিজ উদ্যোগে সেবা ও ত্রাণ কার্যের দায়িত্ব নেন। এই মহান ব্রত পালনের জন্য তিনি আলোকদীপ হাতে মহিলা' (Lady with the Lamp) নামে পরিচিত হন। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে নাইটিঙ্গেল-এর আদর্শের ভিত্তিতে জেনেভা কনভেনশনে আন্তর্জাতিক রেড ক্রুশ স্থাপিত হয়।
