ইতালির ঐক্য আন্দোলনে ক‍্যাভুরের নীতি ও ভূমিকা আলোচনা করো। নবম শ্রেণীর ইতিহাস। তৃতীয় অধ্যায় - school book solver

Thursday, 16 April 2026

ইতালির ঐক্য আন্দোলনে ক‍্যাভুরের নীতি ও ভূমিকা আলোচনা করো। নবম শ্রেণীর ইতিহাস। তৃতীয় অধ্যায়

 


প্রশ্ন:  ইটালির ঐক্য আন্দোলনে ক্যাভুরের নীতি ও ভূমিকা আলোচনা করো।

উত্তর সংকেত : প্রথম অংশ : ক্যাভুরের উদ্দেশ্য ও নীতি :

(১) নেতৃত্বদান, (২) অস্ট্রিয়া বিরোধিতা, (৩) বিদেশি সাহায্য।


দ্বিতীয় অংশ : প্রথম পর্যায় : (১) ক্রিমিয়ার যুদ্ধ, (২) প্লমবিয়ার্সের সন্ধি, (৩) অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, (৪) মধ্য-ইটালির সংযুক্তিসাধন – দ্বিতীয় পর্যায় - মূল্যায়ন


উত্তর>> প্রথম অংশ : ইটালির ঐক্যসাধনে ক্যাভুরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ঐতিহাসিকরা তাঁর ভূমিকার গুরুত্ব চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেছেন যে, আধুনিক ইটালির স্রষ্টা ছিলেন ক্যাভুর (Cavour was the maker of modern Italy)।

ক্যাভুরের উদ্দেশ্য ও নীতি : ক্যাভুর ছিলেন— প্রথমত, দেশপ্রেমিক এবং দ্বিতীয়ত, নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের প্রতি

আস্থাশীল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইটালির স্বাধীনতা অর্জন করে সমগ্র ইটালিকে ঐক্যবদ্ধ করা। এই উদ্দেশ্যকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য তিনি বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করেছিলেন, যথা—

 [১] নেতৃত্বদান : তিনি পরিষ্কার বুঝেছিলেন যে, ইটালির স্বাধীনতা ও ঐক্য-আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হবে পিডমন্ট-সার্ডিনিয়াকে। তিনি আরও বুঝেছিলেন যে, এই নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন্য তাঁর রাজ্যকে সমস্ত দিক দিয়ে উপযুক্ত করে তুলতে হবে। তাই তিনি শাসনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেন।

[২] অস্ট্রিয়া বিরোধিতা : ইটালির ঐক্য ও স্বাধীনতার প্রধান শত্রু ছিল অস্ট্রিয়া; সুতরাং অস্ট্রিয়াকে ইটালি থেকে তাড়িয়ে ইটালির ঐক্য প্রতিষ্ঠার নীতি নেন।

[৩] বিদেশি সাহায্য : একক শক্তিতে ইটালি থেকে বিদেশি শক্তিকে তাড়ানো সম্ভব নয় বলে ইটালির পক্ষে বিদেশি রাষ্ট্রের সাহায্য ও সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি ইটালির সমস্যাকে আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত করতে উদ্যোগী হন। তিনি ইটালিকে ঐক্যবদ্ধ করে সেখানে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী ছিলেন।


দ্বিতীয় অংশ : ইটালির ঐক্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে ক্যাভুরের ভূমিকা ছিল-

প্রথম পর্যায় : ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে পিডমন্ট সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ক্যাভুর তাঁর নীতিকে প্রয়োগ করার সুযোগ লাভ করেন ও যে-পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা হল-

[১] ক্রিমিয়ার যুদ্ধ : ক্রিমিয়ার যুদ্ধে যোগদান করে ক্যাভু প্যারিসের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ) যোগদান করার সুযোগ পান এবং ওই বৈঠকে সার্থকভাবেই ইটালির সমস্যাকে উপস্থাপিত করেন। তিনি ইংল্যান্ডের ও ফ্রান্সের সহানুভূতি লাভ করতে সমর্থ হন।

[২] প্লমবিয়ার্সের সন্ধি : ফরাসিরাজ তৃতীয় নেপোলিয়নের সঙ্গে এমবিয়ার্সের চুক্তি সম্পাদন (১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ) করে তিনি সম্ভাব্য অস্ট্রিয়া-বিরোধী যুদ্ধে তাঁর সহযোগিতা লাভের ব্যবস্থা করেন। এই সহযোগিতার জন্য তিনি নেপোলিয়নকে স্যাভয় ও নিস দান করবার প্রতিশ্রুতি দেন।

[৩] অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ : তিনি

অস্ট্রিয়াকে নানাভাবে উত্তেজিত করে

যুদ্ধে নামতে বাধ্য করেন এবং যুদ্ধে

একের-পর-এক জয়লাভ করতে থাকেন। নিজের স্বার্থ বিবেচনা করে তৃতীয় নেপোলিয়ন যদি মাঝপথে এককভাবে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে ভিল্লাফ্রাঙ্কার সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধ মিটিয়ে না-ফেলতেন, তাহলে

ইটালির ঐক্যসাধন এইসময় অনেক

দূর এগিয়ে যেত। ভিল্লাফ্রাঙ্কার সন্ধি দ্বারা পিডমন্ট-সার্ডিনিয়া মাত্র লোম্বার্ডি লাভ করেছিল এবং এ কারণেই ক্যাভুর বিরক্ত হয়ে রাজা ইমান্যুয়েলকে ওই সন্ধি উপেক্ষা

করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে ক্যাভুরের পরামর্শ না-মেনে রাজা বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে ওই সন্ধি গ্রহণ করলে ক্যাভুর অসন্তুষ্ট হয়ে পদত্যাগ করেন।

[8] মধ্য-ইটালির সংযুক্তিসাধন :

কয়েক মাসের মধ্যেই ক্যাভুর তাঁর ভুল সংশোধন করে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ) এবং কিছুদিনের মধ্যেই মধ্য-ইটালির মডেনা, পার্মা, টাস্কানি ও রোমানার জনগণ পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার©সঙ্গে সংযুক্তির আন্দোলন শক্তিশালী করে তুললে বৃ

ক্যাভুর তৃতীয় নেপোলিয়নকে স্যাভয় ও নিস ছেড়ে দিয়ে এ রাজ্যগুলি পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে নেন। ফলে ইটালির ঐক্যসাধন অনেকটা স্পষ্ট রূপ নিয়েছিল।

দ্বিতীয় পর্যায় : গ্যারিবল্ডির সিসিলি ও নেপলস্ অভিযান এবং তা দখলকে ক্যাভুর কূটনৈতিক কারণে প্রকাশ্যে সমর্থন করতে না পারলেও, গোপনে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। বিভিন্ন কারণে গ্যারিবল্ডি সিসিলি ও নেপলস্-এর দায়িত্ব রাজা ইমান্যুয়েলের হাতে ছেড়ে দেন এবং এরপর বিপুল গণভোটে

নেপলস্, সিসিলি, উমব্রিয়া ও মার্চে (marche) পিডমন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়। শুধুমাত্র রোম ও ভেনেশিয়া ছাড়া সমস্ত ইটালিকে ক্যাভুর ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন।

মূল্যায়ন : সুতরাং দেখা যায় যে, ইটালির ঐক্যসাধনের মূলে ক্যাভুরের ভূমিকা ছিল সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। ক্যাভুরের নেতৃত্ব, নীতি ও কর্মপন্থায় ইটালির ঐক্য সম্ভব হয়েছিল এবং তিনি এক্ষেত্রে ম্যাৎসিনি ও গ্যারিবল্ডির ভূমিকার মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছিলেন। বস্তুতপক্ষে ম্যাৎসিনি, ক্যাভুর ও গ্যারিবল্ডি ছিলেন ইটালির ঐক্যসাধনের তিন মূর্তি। ম্যাৎসিনি ছিলেন ঐক্য আন্দোলনের হৃদয়, ক্যাভুর ছিলেন মস্তিষ্ক আর গ্যারিবল্ডি ছিলেন বাহু।