১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনা সম্মেলন সম্পর্কে আলোচনা করো। নবম শ্রেণীর ইতিহাস। তৃতীয় অধ্যায়
১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ভিয়েনা সম্মেলন সম্পর্কে আলোচনা করো।
উত্তর: সংকেত : ভূমিকা – ভিয়েনা সম্মেলনের বৈশিষ্ট্য :
(১) আন্তর্জাতিক সম্মেলন, (২) জাঁকজমক, (৩) বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিবর্গ, (৪) চার প্রধান, (৫) সভাপতি ও মুখ্যসচিব ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ – ভিয়েনা ব্যবস্থায় গৃহীত মূলনীতি – পর্যালোচনা : (১) উদার চুক্তি, (২) শাস্তি রক্ষা, (৩) যুক্তিগ্রাহ্য ব্যবস্থা ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান নেতৃবর্গের পরিচয়।
উত্তর > ভূমিকা : নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত সম্মেলন ভিয়েনা নামে পরিচিত।
ভিয়েনা সম্মেলনের বৈশিষ্ট্য : ভিয়েনা সম্মেলনের বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
[১] আন্তর্জাতিক সম্মেলন : এই সম্মেলন হল পৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এই সম্মেলনে কেবলমাত্র তুরস্কের সুলতান এবং পোপ ছাড়া ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ অংশগ্রহণ করে।
[২]জাঁকজমক : বিভিন্ন দেশের রাজা, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ, সেনাপতি, প্রধানমন্ত্রী, সাংবাদিকদের আগমনে এই সম্মেলন হয়ে ওঠে জমজমাট ও জাঁকজমকপূর্ণ।
[৩] বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিবর্গ : এই সম্মেলনে যোগদান করেন প্রথম আলেকজান্ডার, অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলার
প্রিন্স মেটারনিখ, প্রাশিয়ার চ্যান্সেলার কার্ল হার্ডেনবাগ, ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড ক্যাসলরি ও ফ্রান্সের প্রতিনিধি দল।
[৪] চার প্রধান : ভিয়েনা সম্মেলনে অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, রাশিয়া, ইংল্যান্ড এই চারটি দেশই (শক্তি) ছিল প্রধান। এই চারটি দেশ ও চার দেশের প্রধানদেরই একসঙ্গে বলা হয় বৃহৎ চতুঃশক্তি বা চার প্রধান (Big Four ) ।
[৫] সভাপতি ও মুখ্যসচিব : প্রিন্স মেটারনিখ ছিলেন এই সম্মেলনের সভাপতি। তিনি ছিলেন এই সম্মেলনের মধ্যমণি। সম্মেলনের মুখ্য সচিব ছিলেন অস্ট্রিয়ার ফ্রিডরিখ ভন জেনৎস্।
ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ : ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হল—(১) নেপোলিয়নের পতনের পর পুনর্গঠনের মাধ্যমে রাজকীয় শক্তিগুলিকে সুসংহত করা,
(২) উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠন ও পুনর্বণ্টন করা,
(৩) ইউরোপে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি প্রতিষ্ঠা করা,
(৪) ইউরোপের বিপ্লবী ভাবধারার গতিরোধ করা,
(৫) ফ্রান্স যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে তছনছ/ছিন্নভিন্ন করে দিতে না-পারে সেদিকে লক্ষ রাখা,
(৬) রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের মধ্যে হৃদ্যতা বজায় রাখা ।
ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্দেশ্য হিসেবে নানারকম উচ্চ আদর্শের কথা বলা হলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল (১) বিজয়ী শক্তি কর্তৃক বিভিন্ন দেশের ভূখণ্ড আত্মসাৎ করা এবং
(২) পরিবর্তনকে ঠেকিয়ে পুরোনো কাঠামোকে ধরে রাখা।
ভিয়েনা ব্যবস্থায় গৃহীত মূলনীতি : ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত তিনটি প্রধান (মূল) নীতি হল – (১) ন্যায্য অধিকার নীতি (Legitimacy),
(২) ক্ষতিপূরণ নীতি (Compensation) ও
(৩) শক্তিসাম্য নীতি (Balance of power)।
- পর্যালোচনা : ভিয়েনা সম্মেলন নানাদিক থেকে সমালোচিত হলেও এই সম্মেলনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, কারণ-
১. উদার চুক্তি : পরাজিত ফ্রান্সের সঙ্গে কখনো প্রতিশোধমূলক ব্যবহার করা হয়নি।
২.শান্তি রক্ষা : সম্মেলনের পরবর্তী ৪০ বছর ইউরোপে শান্তি বজায় থাকার কৃতিত্ব ভিয়েনা সম্মেলনের।
৩. যুক্তিগ্রাহ্য ব্যবস্থা : ঐতিহাসিক ডেভিড টমসনের মতে নানা ত্রুটি সত্ত্বেও সার্বিকভাবে ভিয়েনা সম্মেলন ছিল একটি যুক্তিগ্রাহ্য ও কুটনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন বন্দোবস্ত (a reasonable and statesmanlike arrangement)
