হারুন সালামের মাসি। দ্বাদশ শ্রেণী বাংলা প্রশ্নের উত্তর
![]() |
হারুন সালামের মাসি
দ্বাদশ শ্রেণি বাংলা
কতগুলি প্রশ্নের উত্তর
উৎস
'হারুন সালেমের মাসি' গল্পটি মহাশ্বেতা দেবীর 'স্তনদায়িনী ও অন্যান্য 'গল্প' নামে সংকলিত গল্পগ্রন্থে স্থান পেয়েছে। গল্পটি তিনি রচনা করেছেন ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে (১৩৭৮ বঙ্গাব্দ)।
প্রার্থনা কবিতা প্রশ্নের উত্তর দেখুন
কেন এলো না গল্পের প্রশ্নের উত্তর দেখুন
বিষয়সংক্ষেপ
সমাজসচেতন, ইতিহাস-সচেতন এবং বাস্তবনিষ্ঠ জীবনশিল্পী মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পটি গৌরবী নামে এক অসহায় দুঃখিনী নারীর জীবনালেখ্য। গৌরবীর একমাত্র ছেলে নিবারণ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে নতুন ঘর তুলে, বিয়ে করে বউ ঘরে এনে মাকে ভাত দিতে এবং আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। আত্মসুখী, স্বার্থপর, প্রতিহিংসাপরায়ণ সন্তানের
আচরণে শারীরিকভাবে পঙ্গু, অক্ষম গৌরবী এক গভীর অনিশ্চয়তাময় জীবনের মুখোমুখি হয়। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। নিরুপায়, দিশেহারা গৌরবী আশ্রয়ের আশায় ছুটে যায় মেয়ের কাছে। কিন্তু মেয়ের অভাব-অনটনের সংসারে গৌরবীর নিজেকে অপাঙ্ক্তেয় মনে হয়। এই চরম দুঃসময়ে গৌরবীর দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় মুকুন্দের দয়ায় একটা আশ্রয় পায়। মুকুন্দ তার অনেক সম্পত্তির মধ্যে একটি নতুন বাড়িতে গৌরবীকে আশ্রয় দিয়ে বলে, “ঘরটু' নি ধরে বসে থাকো পিসি।” আশ্রয় হলেও একবেলা দু-মুঠো অন্ন কীভাবে জোগাড় করবে ভেবে পায় না গৌরবি। খিদের জ্বালায় মাঝে মাঝে মেটে আলু সেদ্ধ করে খেয়েছে। তারপর পরিচয় হয় তারই মতো আর-এক অনাথ, দুঃখিনী হারার মার সঙ্গে।
হারার মা তাকে শিখিয়েছে কীভাবে তাদের মতো দুঃখিনীদের বেঁচে থাকতে হয়। নারকেল পাতা চেঁছে, কাঠি নিয়ে কুস্তে বেঁধে, যজ্ঞডুমুরের ডাল ভেঙে, হারার মার সাহায্যে বিল থেকে শাক, গুগলি তুলে শহরে যারা বিক্রি করতে যায় তাদের হাতে দিয়ে কিছু পয়সা পায় গৌরবী এবং তা দিয়ে কোনোমতে তার দিন চলে যায়। তার নিঃসঙ্গ জীবনের একটুকরো আলো হয়ে দেখা দেয় হারার মা। কিন্তু হঠাৎ একদিন সেই হারার মা মারা যাওয়ায় গভীর সংকটে পড়ে গৌরবী। অনিশ্চয়তার কালো মেঘ তার জীবনকে আড়াল করে। এই সংকট গভীরতর হয় যখন মা-হারা অনাথ, অসহায় হারা অন্ন ও আশ্রয়ের নিশ্চিত নিরাপত্তার আশায় গৌরবীর উঠোনে এসে দাঁড়ায়। গৌরবী দিশেহারা—এই পরিস্থিতিতে তার কী করণীয় সেটাই সে বুঝে উঠতে পারে না। তার নিজেরই অন্নের সংস্থান নেই, আর একজনকে অন্ন জোগাবে কীভাবে! অনিশ্চিত এই আশ্রয়ে আর একজনকে কীভাবে আশ্রয় দেবে। তা ছাড়া মুসলমান হারাকে ঘরে ঠাঁই দিলে সমাজ তাকে ক্ষমা করবে না। সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে হারাকে ঠাঁই দেওয়ার সাহস কি তার আছে। বড়ো চিন্তা হল গৌরবীর। কিন্তু মাতৃস্নেহের বিগলিত ধারায় এবং মানবিক অনুপ্রেরণায় দুঃখীর দুঃখ অনুভব করে অসহায়, মা-হারা হারাকে আশ্রয় দেয় গৌরবী। রুগ্ণ দেহ ও অগঠিত মনের হারার বিপন্নতা অনুভব করে গৌরবীর অন্তরে যেন করুণার বান ডাকে। তাই সমস্ত সামাজিক বাধ এবং নিজের অনিশ্চিত অবস্থা উপেক্ষা করে মাতৃ-অঞ্চলে স্থান দেয় হারাকে। হারার একটা নিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে গৌরবী ছুটে যায় ছেলে নিবারণের কাছে। ছেলের কাছে আরও একবার চরম আঘাতে গৌরবীর হৃদয় বিদীর্ণ হয়। মুসলমানের ছেলেকে ঘরে তুলেছে শুনে নিবারণ গোটা সমাজের
হয়ে নির্দয়ভাবে নির্লজ্জ ভাষায় মাকে আক্রমণ করে বলে, “ও পাশ বিদেয় করো। তারপর ভেবে দেখব।” গৌরবা মুখ বুজে সেই আক্রমণ সহ্য করে। কিন্তু নিবারণ যখন বলে হারাকে সে উদ্বাস্তুদের মধ্যে ফেলে আসবে-খেতে পেলে খাবে, না খেতে পেলে মরে যাবে-সে কথায় গৌরবীর বুক ভেঙে যায় ব্যথায় ও কষ্টে।
হারাকে আশ্রয় দেওয়ায় অপরাধে সে গৌরবীকেও আশ্রয়চ্যুত করে। এবং স্পষ্টভাবে বলে দেয়, “ও ছোঁড়াকে যদি বিদায় না কর আমার ভিটেছেড়ে দাও।” গৌরবীও সেই মুহূর্তে স্থির সিদ্ধান্তে সংকল্প করে—হারাকে নিয়ে সে শহরে চলে যাবে।
অবজ্ঞায়, অবহেলায় ছেলে নিবারণ মাকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছিল। শত দারিদ্র্য, দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণার মধ্যেও গৌরবীর মাতৃহৃদয়ের স্নেহ-মায়া-মমতার ধারা শুকিয়ে যায়নি। দারিদ্র্যের চরম লাঞ্ছনা সত্ত্বেও গৌরবী যে একজন মা। মা-হারা অসহায় হারার সান্নিধ্যে মায়ের সেই স্নেহ-মায়া-মমতার ধারা উদ্বলিত হয়ে উঠেছে। হারার মাসি গৌরবী কবে যেন হারার মা হয়ে সন্তানের মঙ্গলের জন্যে চিরন্তনী জননী-মূর্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। যে জননী সমাজের নিয়ম বিধি, অনুশাসন মানে না; আনুষ্ঠানিক ধর্ম মানে না; জাতপাতের বিচার মানে না -অসহায় সন্তানের জন্য যার অন্তরের শুধু করুণার ধারা বর্ষিত হয়। দুঃখিনী গৌরবী সেই চিরন্তনী জননী রূপে দীপ্তিময়ী হয়ে উঠেছে আলোচ্য গল্পে।
নামকরণ
সাহিত্যের যে-কোনো শাখায় নামকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নামকরণ হল যে-কোনো রচনার গভীরে প্রবেশের চাবিকাঠি। সাহিত্যিকগণ সাধারণত তিন ধরনের নামকরণ করে থাকেন-চরিত্রকেন্দ্রিক, বিষয়কেন্দ্রিক এবং ব্যঞ্জনাধর্মী। মহাশ্বেতা দেবীর 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পটির নামের মধ্যেই আছে গভীর ব্যঞ্ছনা। তাই আলোচনা করে দেখা যেতে পারে ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণ হিসেবে গল্পটির নামকরণ যথার্থ কিনা।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রাম্য নিম্নবিত্ত সমাজের এক দুঃখিনী নারী গৌরবী। গৌরবীর আর্থিকভাবে স্বচ্ছল একমাত্র ছেলে নিবারণ নতুন ঘর তুলে, বিয়ে করে বউ ঘরে এনে নিজের সুখের জন্য মাকে ভাত দিতে এবং আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। মেয়ের কাছে গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। অনিশ্চয়তাময় জীবনের চরম দুঃসময়ে দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় মুকুন্দের দয়ায় একটা আশ্রয় পায় গৌরবী। কিন্তু একবেলা কীভাবে দুটো ভাত জোটাবে তা ভেবে পায় না। খিদের জ্বালার যখন মেটে আলু সেদ্ধ করে খেয়ে গৌরবীর দিন কাটছিল সেইসময় একদিন হারার মা-র সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারই মতো। অসহায় দুঃখিনী নারী হারার মা। তাই সে জানে তাদের মতো দীন-দরিদ্রদের লড়াই করে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। গৌরবীকেও তা শেখায়। হারার মার সাহচর্যে গৌরবীর জীবনে নিঃসঙ্গতা কিছুটা দূর হয়। সেই হারার মা একদিন মারা যাওয়ায় চরম সংকট ঘনিয়ে আসে গৌরবীর জীবনে। একদিকে দু-মুঠো ভাতের জোগাড় করার দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুর্ভাবনা – “আমি বা কোথায় মরব, কে মুখ শলা করবে কে জানে!” গৌরবীর বুকের মধ্যে যখন অপার শূন্যতা, সেইসময় মা-হারা অনাথ হারা এসে দাঁড়ায় গৌরবীর উঠোনে। হারা যে ধর্মে মুসলমান— গৌরবী তাকে ঠাঁই দেয় কেমন করে! চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গৌরবী। দোলাচলতা
তৈরি হয় মনে। হারাকে ঘরে থাকতে দিলে তার সমাজের লোকেরা তাকে একঘরে করবে। তা ছাড়া তার নিজেরই অন্ন-সংস্থান নেই, হারাকে খেতে দেবে বা কী! কিন্তু মাতৃস্নেহের মমতায় হারাকে সে ফেরাতে পারে না।
মা-হারা ওইটুকু ছেলে, সাতকুলে কেউ নেই– কোথায় যাবে! খুব রাগ হয় হারার মা-র ওপর। তার ভরসায় ছেলেকে রেখে নিশ্চিন্তে চোখ বুজল। মৃত্যুর আগে হারার মা হারাকে বলে গিয়েছিল, “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস”—হারা সে-কথা গৌরবীকে বলায় “গৌরবীর শুকনো বুকে যেন কিসের ঢেউ লাগল।” সেই ঢেউ যেন অপার স্নেহ-মায়া-মমতার, জননীর অন্তরের করুণার ধারা।
গল্পে গৌরবীর পরিচয় হারার মাসি হিসেবে। হারা গৌরবীকে মাসি বলেই জানে, মাসি বলেই ডাকে। গৌরবীও হারার মাসি ডাকেই সারা দেয়। কিন্তু
মাতৃ-মমতার শূন্যতা পূর্ণ করে করেই যেন গৌরবী হারার মা হয়ে উঠেছে। নিবারণের অবহেলিত জননী হারার জননী হয়ে আবার মাতৃ-গৌরবের আসনে আসীন হল; যার স্নেহ, করুণা কোনো জাত মানেনি, ধর্ম মানেনি; সামাজিক বিধিনিষেধ, সমাজের রক্তচক্ষু কোনোকিছুই মানেনি—স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার অন্তরের করুণাধারা বর্ষিত হয়েছে সন্তানের প্রতি। এরপর শুরু হয় হারাকে বাঁচানোর এবং বড়ো করে তোলার আশ্চর্য সংগ্রাম। ধর্মের দোহাই-এ আশ্রয় জোটে না ছেলে নিবারণের কাছে; জোটে তীব্র ভাষায় নিন্দা ও অমানবিক আঘাত। এই অবিবেচক, মানবিকতাবোধহীন, নির্দয় সমাজ থেকে অনেক দূরে হারাকে নিয়ে চলে যায় গৌরবী—“শোন, আমরা শওরে যাব। সেখানে কেউ কারো কোনো কথা জানতে চায় না। কেউ কারে চিনে না।” জাতপাত, সংকীর্ণ মানসিকতা, অন্ধ বিধি নিষেধের ঊর্ধ্বে চিরন্তন মাতৃহৃদয়ের অধিকারিণী চিরন্তনী জননীর আলেখ্য 'হারুন সালেমের মাসি
গল্পের হারার মাসি গৌরবীর কাহিনি। এই নামের মধ্যেই লেখিকা গভীর ব্যঞ্জনা নিহিত করেছেন। তাই ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণ হিসেবে হারুন সালেমের মাসি' নামকরণটি যথার্থ ও সার্থক হয়েছে।
প্রশ্ন:-“হারা গৌরবীর উঠোনে এসে দাঁড়াল।”- গৌরবীর উঠোনো এসে দাঁড়ানোর কারণ কী?
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হারা ওরফে হারুন। গল্পের মধ্যে তার জীবনের কঠিন সময়ের বেদনাদীর্ণ চিত্র লেখিকা তুলে ধরেছেন।
হারার পিতৃবিয়োগ : হারার বয়স সাত, সে ধর্মে মুসলমান। তার বাবা ছিল ঘরামি। শখ করে নিজেদের ঘরখানা তাই উঁচু করে বেঁধেছিল। কিন্তু সেই ঘরের সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ঘর তোলার কিছুদিন পরেই হারার বাবা সাপের কামড়ে মারা যায়। অতি অল্প বয়সেই পিতৃহীন হয় হারা। এরপর ছোট্ট হারাকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকার এবং অস্তিত্ব রক্ষার অসম লড়াইে অবতীর্ণ হয় তার মা আয়েছা বিবি।
সমাজের রক্তচক্ষু ও মাতৃত্বহীনতা : একদিকে নিষ্ঠুর, স্বার্থপর, হৃদয়হীন সমাজব্যবস্থা অন্যদিকে হারাকে নিয়ে সেই সমাজে বেঁচে থাকার তীব্র লড়াই। সামান্য ঘরামি হয়ে হারার বাবার উঁচু ঘর তোলাকে যে সমাজ মনে করে। ‘কাঙালের আস্পর্ধা’ সেই সমাজে বেঁচে থাকতে হলে প্রতিমুহূর্তে যে সংগ্রাম করতে হবে তা জানত হারার মা। শাক, গুগলি তুলে, নারকেল পাতা চেঁছে নানা উপায়ে তা বিক্রি করে জীবনধারণ করত হারার মা। তারই মতো আর এক
দুঃখী গৌরবীকেও বাঁচতে সাহায্য করেছিল এই হারার মা। নানা প্রতিকূলতায় বেঁচে থাকার তীব্র লড়াই ও সমাজের রক্তচক্ষুর নানা যন্ত্রণা নিয়েই হারার মা রোজ রাতে ঘুমোতে যেত। স্বামীর বাঁধা সেই উঁচু ঘরেই শুয়ে চোখের ওপর হাত দিতে প্রতি রাতে সে কাঁদত। হারার মায়ের এই বেদনাদীর্ণ কান্না সমাজের কানে পৌঁছোত না। প্রায় প্রতি রাতেই তার জ্বর আসত। কিন্তু ওষুধ কেনার সামর্থ্য ছিল না। বুকের কষ্ট বুকে চেপে একদিন রাতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমের মধ্যে হারার মা পৃথিবী ছাড়ে। পিতৃ-মাতৃহীন অনাথ হারা তাই মাসি গৌরবীর উঠোনে এসে দাঁড়ায় তার শেষ নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়।
প্রশ্ন:- “হারার বয়স সাত হলে কী হয়, জ্বরে জ্বরে জিভ এড়ে কথা ওর সড়গড় হয়নি এখনও।”—হারার জীবন ও চরিত্রের যে রূপ লেখিকা আলোচ্য গল্পে তুলে ধরেছেন তার পরিচয় দাও।
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি' গল্পের মুখ্য চরিত্র গৌরবীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হারা ওরফে হারুন। গল্পের উপজীব্য বিষয় এবং বক্তব্যের মধ্যে হারা চরিত্রটির বিশিষ্ট ভূমিকা আছে। হারা চরিত্রের রূপ নির্মাণে লেখিকা গভীর আন্তরিকতা ও সহানুভূতি দেখিয়েছেন।
নিঃস্ব ও রিক্ত হারা : হারার বয়স মাত্র সাত বছর। অভাবজনিত অপুষ্টিতে তার শরীর তেমন সুগঠিত হয়নি, মনও অপরিণত। হারা ভালো করে কথা বলতে পারে না, “জ্বরে জ্বরে জিভ এড়ে কথা ওর সড়োগড়ো হয়নি এখনও।” তার বাবা ঘরামি হওয়ায় উঁচু করে ঘর বেঁধেছিল। কিন্তু ঘর তোলার কিছুদিনের মধ্যেই হারার বাবা মারা যায়। তারপর সেই ঘর বাঁধা পড়ে।এক সম্পত্তিলোভীর কাছে। তাই হারার মাও যখন অকালে মারা গেল তখন হারা শুধু বাপ-মা হারা অনাথই হল না, সহায়সম্বলহীন নিঃস্বও হয়ে গেল।
গৌরবীর সাহচর্য লাভ : এই রুগ্ণ পিতৃ-মাতৃহীন হারা আশ্রয় ও অন্নের আশায় আজ দাঁড়িয়েছে মাসি গৌরবীর উঠোনে। দূরসম্পর্কের কাকা তার দায়িত্ব নেয়নি। কিন্তু গৌরবীর মাতৃহৃদয় হারার জন্য কেঁদে ওঠে। ধর্মে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও হারাকে ফেরাতে পারে না গৌরবী। দুঃখী আর-এক দুঃখীর মন বোঝে। মাসির মমতাময় বুকে নিশ্চিন্ত নিরাপত্তা বোধ করে হারা। তবে
হারার সমাজ আলাদা, জাত আলাদা। তাই ঘরে আশ্রয় দিতে সাহস হয় না। গৌরবীর, দাওয়ার শুতে দেয়। ঘুমের মধ্যে হারা অল্প অল্প ফোঁপায়, গৌরবীর মনে হয়, “বুঝি মা-র কথা ভাবে।” তাই হারার কাছে গিয়ে তার গায়ে হাত দিয়ে বলে, “ভয় কী?” হারা বুঝতে পারে তার আর কোনো ভয় নেই।
হারার মাসি-ই হারার মা : হারার কারণে যখন গৌরবীর নিরাপদ আশ্রয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তখন হারার মায়ের ওপর রাগ হয় গৌরবীর। কিন্তু হারা যখন মেটে আলু নিয়ে এসে বলে, “মাসি, মেটে আলু আন্না করবে?” তখন গৌরবীর মুখ হাসিতে ভরে যায়। তারপর নানা কথায় হারা বলে রে, তার মা তাকে বলেছিল, “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস।” হারাও তাই করেছিল। স্নেহ-মায়া-
-মমতায় জড়ানো হারার মাসি গৌরবী যেন কবে হারার মা হয়ে উঠেছিল।
মাসির আঁধার ঘরের আলো হারা : সমাজের অন্ধ অনুশাসন থেকে হারাক বাঁচাতে গৌরবী যশিকে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে বলে। যশির হৃদয়হীন বক্তব্য, “শহরে ছেড়ে দিতে পারি। ভিক্কে করে খাবে।” গৌরবীর অন্তর সায় দেয় না। হারাকে সে ভাসিয়ে দিতে পারবে না কিছুতেই। হারা বুঝতে পারে তার জন্য মাসির দুশ্চিন্তা, সেই সঙ্গে মায়া- মমতা। কিন্তু হারার দিয়ে কিছু করার সাধ্য নেই। তবে একটা দোকানে কাঠ এনে ও পাতা কুড়িয়ে দিয়ে সেই মানের মালিকের দেওয়া একটুখানি কেরোসিন সে দেয় মাসিকে, যা দিয়ে
মাসির ঘরে আলো জ্বলে। গৌরবীর অন্ধকার ঘর এইভাবে আলোয় ভরিয়ে দেহ হারা। যে মাসি তাকে অনাথের দুঃখ থেকে, মা হারাবার কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়েছে; হারা সেই মাসির শুষ্ক বুক সজীব করে, শূন্য বুক পূর্ণ করে মাসির অন্ধকারময় জীবন আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে। এখানেই হারা চরিত্রের গুরুত্ব।
প্রশ্ন : “মনে করেছে কাঙালের আস্পর্দা”—উক্তিটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর : প্রসঙ্গ : মানবদরদি লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পে জাতপাত, অন্ধ-অনুশাসন ও সংস্কারের কুটিল জালে আবদ্ধ এক ভগ্ন সমাজের চিত্র অঙ্কিত। সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ হারার বাবা ছিল ঘরামি। শখ করে তাই নিজের ঘরটি একটু উঁচু করে বেঁধেছিল। কিন্তু সমাজের গণ্যমান্য পালবাবুদের চেয়ে উঁচু ঘর তোলা সমাজের চোখে ভালো ঠেকেনি। তাই তাঁরা ব্যঙ্গোক্তির সুরে প্রশংসার ছলে মাটিতে থুতু ফেলে নিন্দা করেছিল। দুঃখী, দরিদ্রের যে এমন উঁচু ঘর তোলা উচিত হয়নি, সে-কথা ভেবেই হারার মায়ের এমন কথা মনে হয়েছে।
তাৎপর্য : আসলে স্বার্থপর, হৃদয়হীন, কুটিল এই সমাজে আধিপত্য বজায় রেখেছে কায়েমি একশ্রেণির স্বার্থান্ধ মানুষ। নিজেদের স্বার্থ ও অধিকার টিকিয়ে রাখার জন্য গরিব দুঃখীদের ওপর চলে নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা। সামাজিকভাবে
পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের শখ ও উন্নতি তাই সহ্য করতে পারে না তারা। হারার বাবা গরিব হয়ে, পালবাবুদের চেয়ে সামান্য ও নগণ্য হয়ে স্পর্ধার সঙ্গে পালবাবুদের থেকে উঁচু ঘর তোলে—এটা সমাজ মেনে নিতে পারে না। লেখিকার তির্যক মন্তব্য, “তোমার ছেলে-বিবির ভিখিরির দশা। তুমি সামান্য ঘরামি। তুমি পালবাবুদের চেয়ে উঁচু ঘর তোলো কেন?” সামান্য
ঘরামির ঘর এতটাই উঁচু যে তাদের মাথা তুলে দেখতে হবে! গরিবদের এ শখ বা ইচ্ছা সমাজের চোখে স্পর্ধার সামিল। সুতরাং দলিত হয়ে সারাজীবন যে তাদের পালবাবুদের পায়ের নীচে অবস্থান করতে হবে, এই নির্মম সত্যটি এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রশ্ন : “এইসব সময়ে গৌরবীর বড়ো কষ্ট হয়।”—কোন্ সময়ের কথা বলা হয়েছে? এই সময়ে গৌরবীর কষ্ট হয় কেন?
উত্তর : প্রশ্নোদ্ভূত সময়ের বর্ণনা : মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের।মাসি' ছোটোগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌরবী। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বার্থপর, প্রতিহিংসাপরায়ণ সন্তানের কাছে আশ্রয় পায়নি গৌরবী। দূরসম্পর্কের আত্মীয় মুকুন্দের দয়ায় কোনোরকমে একটা আশ্রয় পেলেও কীভাবে একবেলা খাবার জোটাবে তা ভেবে পায় না। তার মতো আর-এক দুঃখিনী হারার মায়ের সাথে পরিচয় হওয়ার পর হারার মা তাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে, বিভিন্নভাবে
তাকে সাহায্য করেছে। তার নিঃসঙ্গ জীবনের একান্ত সঙ্গী ছিল হারার মা একদিন সকালে হারা এসে জানায় যে তার মা আসতে পারবে না; শুয়ে
আছে কথা বলছে না। গৌরবী পা টেনে টেনে হারাদের ঘরে গিয়ে দেখল হারার মা শুয়ে আছে। তার প্রথমেই মনে হয়েছিল হারার মা কাঁদছে। তারপরে ভালো করে দেখে বুঝল হারার মা বেঁচে নেই। বিকেল নাগাদ ।
প্রশ্ন:- “কী ভয়ানক প্রতিহিংসা নিবারণের,”– কোন্ প্রসঙ্গে উক্তিটি করা হয়েছে? নিবারণের প্রতিহিংসার কারণ কী?
উত্তর : প্রসঙ্গ : মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌরবী গ্রামবাংলার এক হতভাগী দুঃখিনী নারী। গৌৱনীর
দুই সন্তান—নিবারণ ও পুঁটি। নিবারণের বয়স যখন খুবই কম তখন পুঁটির বিয়ের জন্য একটা ভালো সম্বন্ধ আসে—পাত্র বাসের কনডাক্টর। এমন পাত্র হাতছাড়া করতে চায়নি গৌরবীর স্বামী। কিন্তু পাত্রপক্ষের দাবিমতো পণ দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বাসের কনডাক্টরকে জামাই করতে গিয়ে তাই বাধ্য হয়ে নিবারণের বাবা ঘর তৈরির টাকা ভেঙে ঘড়ি, সাইকেল, টর্চ কিনেছিল। নিবারণ তখন ছোটো হলে কী হবে, তার মনে এই ঘটনা প্রভাব ফেলেছিল। সাইকেলটা দেখতে দেখতে নিবারণ বলেছিল, “সব একজনকে দিবি? তোমার একটা সন্তান?” গৌরবী বলেছিল, “তোর এত রিষ কেন? সময়ে পুঁটি আমায় ভাত দিবে। কোন্ মেয়েটা আজকাল মা-বাপকে দেখে না বল্?” নিবারণ বলেছিল, “ভালো। সময়ে বুঝা যাবে।” অনেক বছর পর অসহায় গৌরবী ছেলের কাছে আশ্রয় ও খাবার চাইলে প্রতিহিংসাবশত নিবারণ সেই কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
নিবারণের প্রতিহিংসার কারণ স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানই হয় তীর শেষ আশ্রয়। স্বামীর মৃত্যুর পর গৌরবীও ভেবেছিল নিবারণের কাছে থেকে জীবনের শেষ দিনগুলি কোনোভাবে কাটিয়ে দেবে। কিন্তু নিবারণ মাকে রাখতে চায়নি। নিবারণের বউ কিছু বলবার আগে সে মাকে বলেছে, "এবার পুঁটির কাছে যাও গিয়া। মাঝে মধ্যে আমি খবর দিব।” গৌরবী প্রথমে নিবারণের কথা বুঝতেই পারেনি। কিন্তু নিবারণ পুঁটির বিয়ের সময়ে যৌতুক দেওয়ার প্রসঙ্গ। মনে করিয়ে দিয়ে বলেছে, “কেন, মনে নাই।” কিছুই ভোলেনি নিবারণ। গৌরবী তারপর বুঝেছিল আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও মায়ের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মাকে সে ভাত দিতে অস্বীকার করেছে।
প্রশ্ন:; "বড়ো দুঃখ হল গৌরবীর। তারপর মনে হল তার চেয়ে "হারার মা ভাগ্যবতী।"-গৌরবীর দুঃখ হল কেন? তার চেয়ে হারার মা ভাগ্যবতী মনে হওয়ার কারণ কী?
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের মাসি ছোটোগল্পটি বঞ্চিত, অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া সাধারণ মানুষের জীবন্ত দলিল। সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের অন্তর্বেদন লেখিকা অনুভব করেছেন আন্তরিকভাবে।
গৌরীর দুঃখের কারণ : গ্রামবাংলার নিম্নবিত্ত সমাজের এক দুঃখিনী নারী গৌরবী। শারীরিক অক্ষমতার চেয়ে তার জীবনকে অনেক বেশি দুর্বিসহ করে তুলেছে এই সমাজ ও মানুষের স্বার্থপরতা, হৃদয়হীনতা নিষ্ঠুরতা।
স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানের কাছে শেষ আশ্রয় পায় মায়েরা। কিন্তু নিবারণ প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে গরুর দিকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে।। অসহায় দুঃখিনী মা মেয়ের কাছে গিয়েও বিফল মন নিয়ে ফিরে আসে। তখন 'দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় মুকুন্দের সহায়তায় একটা নতুন বাড়িতে আশ্রয় পেলেও কীভাবে একবেলা দুটো ভাত জোটাবে ভেবে পায় না গৌরবী। তার সেই ঘোর দুর্দিনে এগিয়ে আসে হারার মা, তাকে বেঁচে থাকার পথ দেখায়। তার নিঃসঙ্গ জীবনে একটুকরো আলোর ফুলকি হয়ে দেখা দেয় হারার মা নারকেল পাতা চেঁছে তা দিয়ে কুস্তে বেঁধে, শাক, গুগলি তুলে, যজ্ঞডুমুরের ডাল ভেঙে সেসব শহরে নিয়ে যারা বিক্রি করে তাদের দিয়ে কিছু পয়সা পায় গৌরবী—তাতে চাল, খুদ কিনে অন্তত একবেলা খাওয়া জোটে। গৌরবীর জীবনের নিঃসঙ্গতা অনেকটাই দূর করেছিল হারার মা। সেই হারার মা হঠাৎ একদিন মারা যাওয়ায় বড়ো দুঃখ হল গৌরবীর।
গৌরবী জানত হারার মা তারই মতো দুঃখিনী—নিতা অভাব-অনটনের জীবন। স্বামীর মৃত্যুর পর একপ্রকার সংগ্রাম করে অতি কষ্টে বেঁচে ছিল হারার মা, মরে গিয়ে সমস্ত দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে তাই হারার মা মারা যাওয়ায় গৌরবীর ঠিক দুঃখ হয়নি; বরং ভাগ্যবতী মনে হয়েছে। মৃত্যুর পর আয়েছা বিবি হারার হাতের মাটি পেয়েছে, নিজের ঘরে শুয়ে মরেছে। কিন্তু নিবারণ গৌরবীকে দেখে না, চিরকালের জন্য দূরে ঠেলে
দিয়েছে—তার কেউ নেই এখন সংসারে। খোঁড়া পা নিয়ে সে এখন কীভাবে শাক, গুগলি তুলবে, কীভাবে-বা খাওয়ার টাকা জোগাড় করবে! এ ছাড়া গভীর এক দুঃখ তাকে গ্রাস করে—মরে গেলে ছেলের হাতের আগুনটুকু পাওয়ার
কোনো আশাই তার নেই। গৌরবী ভাবে, তারই মতো দুঃখিনী হয়েও হারার মা তার চেয়ে ভাগ্যবতী, ছেলের হাতের মাটি পেয়েছে।
প্রশ্ন:- “ভাবতেই ওর কষ্ট হল।”— কোন কথা ভাবতে কার, কেন কষ্ট হয়েছিল?
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌরবি পিতৃমাতৃহীন, নিঃসঙ্গ, অনাথ হারার কথা ভেবে কষ্ট পেতো।
মাত্র সাত বছর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে অনাথ হয়ে পড়ে হারা। তার সাতকূলে কেউ নেই। যাকে সে কাকা বলে ডাকত সেও তার নিজের নয়। মাতৃত্বের দাবি নিয়ে তাই অনাথ হারা গৌরবীর উঠোনে এসে দাঁড়ায়। সামাজিক বাধাবিঘ্নের ভাবনায় দ্বিধা ও দোলাচলতায় অপ্রস্তুতে পড়ে গৌরবী। কিন্তু মাতৃত্বের মমতায় মনের মধ্যে জায়গা তৈরি হয়ে যায় হারার জন্য। হারার অসহায়ত্ব ও তার প্রতি অপত্যস্নেহ গৌরবীর হৃদয়কে বিগলিত করে। সেই ভাবনা থেকে মনের মধ্যে হারার জন্য দুশ্চিন্তার মেঘ ঘনীভূত হয়। হারার ভবিষ্যৎ কোন পথে কীভাবে এগোবে তা ভেবে।গৌরবী কষ্ট পায়।
কষ্ট হওয়ার কারণ :- গৌরবীর নিজের ছেলে নিবারণ স্বার্থপর, মাকে দেখে না। নিবারণের শূন্যতা যেন অচিরেই পূর্ণ করে হারা। গৌরবীর বিপদের দিনে হারার মা তাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। সেই হারার মারা যাওয়ায় অনাথ হারা মাসির সাহচর্য পেতে চাইত। সে প্রায়ই গৌরবীর উঠানে এসে বসে থাকত। গাছের ছায়ায় ঘুমাতো। মা-র গাছের ধঁধল, চিচিেঙ্গে গৌরবীকে দিয়ে যেত। মারা যাওয়ার পূর্বে যেভাবে গৌরবীর নিঃসঙ্গ জীবন হারার মা ভুলিয়ে রেখেছিল, মৃত্যুর পর ছোট্ট হারাও গৌরবীকে কখনও নিঃসঙ্গ একা হতে দেয়নি। তাই সুস্থ ভবিষ্যৎ দিতে, ছোট্ট হারাকে বাঁচিয়ে রাখতে তার ভবিষ্যতের কথা ভাবত গৌরবী। এই কারণে হারাকে দেখতে
না-পেলে গৌরবীর কষ্ট হত।
প্রশ্ন। “কি বিপদ, কি বিপদ। ওর নিজের বলতে কেউ নেই ?”— কে, কোন বিপদের কথা ভেবেছে? যাকে কেন্দ্র করে বিপদের কথা ভেবেছে তার কী ব্যবস্থা সে করল?
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পের মুখ্যচরিত্র গৌরবী ভেবেছে তার বিপদের কথা।
সম্ভাব্য বিপদ : গ্রামবাংলার অসহায় দুঃখিনী নারী গৌরবী। স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলে নিবারণ ভাত ও আশ্রয় দিতে অস্বীকার করায় চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক কষ্টে যখন গৌরবীর দিন কাটছে, সেইসময় দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়
মুকুন্দের দয়ায় সে একটা আশ্রয় পায়। আশ্রয় পেলেও একবেলা ভাতের ব্যবস্থা হয় না গৌরবীর। সেই চরম সংকটের সময় হারার মা-র পরামর্শে ও সাহায্যে বিল থেকে গুগলি, শাক, দুর্বা ঘাস তুলে, সামান্য যে-কটা পয়সা পায় তা দিয়ে কোনোমতে একবেলা চলে যায় তার। কিন্তু সেই সুখটুকু স্থায়ী হল না—একদিন হঠাৎ হারার মা মারা গেল। গৌরবীর সামনে আবার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। গৌরবী কিছুটা দিশেহারা। ঠিক সেইসময় মা-হারা অসহায় হারা তার উঠোনে এসে দাঁড়ায় আশ্রয় ও অন্নের আশায়। গৌরবীর নিজের অন্নের সংস্থান নেই, আশ্রয়ও তার নিজের নয়—সে কীভাবে আর একজনকে অন্ন ও আশ্রয় দেবে! গৌরবী জানে হারা তারই মতো আর-এক দুঃখিনী মায়ের অসহায় ছেলে। গৌরবী বুঝতে পারে না সে কী করবে। এটুকু শুধু বোঝে যে, দারুণ সংকটে পড়েছে সে।
বিপদ থেকে বাঁচার উপায় : হারার মা গৌরবীকে শিখিয়েছিল বেঁচে থাকার জন্য কীভাবে সংগ্রাম করতে হয়। পিতৃ-মাতৃহীন অসহায় হারার মুখে এই স্বার্থপর সমাজের কেউ যখন একমুঠো ভাত ও আশ্রয় দেওয়ার কথা ভাবে না, গৌরবী সেই অসহায় হারাকে কীভাবে ফিরিয়ে দিতে পারে। মাসি বলে হারা যখন গৌরবীকে ডাকল, গৌরবীর বুকের মধ্যে মাতৃস্নেহের ঢেউ উঠল। মমতায় এবং মানবিকবোধে উদ্বেল-হৃদয় গৌরবী মুসলমান হারাকে আশ্রয় ও মুখে অন্ন দেওয়ার কথা ভাবে। মা-হারা হারাকে মায়ের স্নেহছায়ায় বাঁচিয়ে রাখার কথা ভাবে, তাকে বড়ো করে তোলার কথা ভাবে গৌরবী। স্বপ্ন দেখে গৌরবী, যেমন করে সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে মা।
প্রশ্ন :- “অসম্ভব দুশ্চিন্তা হল গৌরবীর।”—কাকে নিয়ে এই দুশ্চিন্তা? দুশ্চিন্তার কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর : যাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা : মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের মাসি' ।
গল্পে জাতপাতের বিভেদে জর্জরিত গ্রামীণ জীবনে ধর্মনিরপেক্ষ, মাতৃমমতায় পুষ্ট এক না খেতে পাওয়া নারী গৌরবীর মানবিক সংগ্রাম ও সিদ্ধান্ত উচ্চারিত হয়েছে। গৌরবী এই গল্পের মুখ চরিত্র। তার ছেলে নিবারণ তাকে কাছে রাখে না। নিবারণের সেই শূন্যতা পূর্ণ করেছে হারা। গৌরবীর জীবনের সঙ্গে। হারা তাই ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে। সেই অনাথ, দুঃখী ছোট্ট হারার জন্য
গৌরবীর নানা দুশ্চিন্তা।
দুশ্চিন্তার কারণ : সদ্য মাতৃবিয়োগ হওয়ার পর নিঃসঙ্গ, অসহায় হারা গৌরবীর উঠোনে এসে দাঁড়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। হারার মার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কসূত্রে গৌরবীকে সে মাসি বলে ডাকে। হারার মা মারা যাওয়ার আগে হারাকে বলে গিয়েছিল, “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস।” কিন্তু মাসির যে অন্নের সংস্থান নেই, পরের আশ্রয়ে তার বাস। তাই অসহায় হারার জন্য কী করবে বা তাকে কীভাবে আশ্রয় দিয়ে নিজের কাছে রাখবে তা ভেবে পায় না গৌরবী। হারা যে ধর্মে মুসলমান। তাই মুসলমানের ছেলেকে হিন্দুর বাড়িতে রাখলে সমাজ কিছুতেই মেনে নেবে না। সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে হারাকে যে আশ্রয় দেবে, সে সামর্থ্যও গৌরবীর নেই। নানা দ্বিধা-দোলাচলতায় গৌরবীর মধ্যে নানা দুশ্চিন্তা উপস্থিত হয়। একদিকে হারার প্রতি প্রবল স্নেহ ও মাতৃত্ববোধ, অন্যদিকে সংকীর্ণ মানসিকতার অমানবিক সমাজ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে গৌরবীর দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়।
প্রশ্ন:- "গৌরবীর মনে হল এই তো স্বর্ণা গৌরবীর কখন, কেন এমন মনে হয়েছিল?
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবীর 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পের মুখ্য চরিত্র গৌরবী। ছেলে নিবারণের কাছ থেকে আহার ও আশ্রয়ের নিরাপত্তা না-পেয়ে তার জীবন যখন ঘোর অনিশ্চিত, তখন হারার মা তাকে বাঁচার নতুন পথ দেখায়। হারার মা তাকে শেখায় তাদের মতো গরিবদের কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। নারকেল পাতা চেঁছে, কাঠি নিয়ে কুস্তি বেঁধে, হারার মার সাহায্যে শাক, গুগলি তুলে; যজ্ঞডুমুরের ডাল ভেঙে তা নিয়ে যারা শহরে যায়, সেসব তাদের কাছে দিয়ে যে ক-টা পয়সা
পায় তাতে কোনোমতে দিন চলে যায় গৌরবীর। দারিদ্র্যতা তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু গরিবেরও স্বপ্ন থাকে, স্বপ্নে সুখও থাকে। গৌরবীও একদিন স্বপ্নে দেখে হারার মা তাকে এক আশ্চর্য দেশে নিয়ে গেছে, যেখানে থানকুনি পাতা আর দুর্বাঘাসের মেলা। মাদার গাছের ছায়ায় ঢেঁকিশাকের জঙ্গল। এত শাক-পাতা গৌরবী একসাথে কখনও দেখেনি। দু-হাতে সেই শাক-পাতা তুলতে তুলতে স্বপ্নে গৌরবীর এমন মনে হয়েছিল।
গৌরবীর স্বর্গ মনে হওয়ার কারণ : স্বামীর মৃত্যুর পর শারীরিকভাবে অক্ষম, অসহায় গৌরবীর শেষজীবনের আশ্রয় ছিল ছেলে নিবারণ। কিন্তু নিবারণ আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েও নিজের সুখের স্বার্থে ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মাকে ভাত
এবং আশ্রয় নিতে অস্বীকার করে। অনিশ্চয়তাময় জীবনের মুখোমুখি হয়ে দিশেহারা গৌরবী মেয়ের কাছে ছুটে গেলে সেখানেও আশ্রয় হয়নি। তাই নানা দুশ্চিন্তা ও বুকে একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে রোজ ঘুমোতে যেত গৌরবী। তার মনে হয়েছে, যদি নিবারণ তাকে কাছে রাখত তাহলে হয়তো অনেক।সচ্ছলভাবে সে জীবন কাটাতে পারত। নিজের ও হারার অনিশ্চিত জীবনের নানা দুশ্চিন্তা মাথায় ঘোরে, গৌরবী স্বপ্ন দেখে —“স্বপ্নেগৌরবীকে নিবারণ মাথায় করে রাখে।” বাস্তবে সে যা পায় না, স্বপ্নে যেন তা হাতের মুঠোয় পেয়ে যায়। স্বপ্নের গৌরবীর মাথায় তেল জবজব করে, পরনে থাকে মোটা কাপড় আর পেটে ভাত। খিদের তাড়নায় তাকে কষ্ট পেতে হয় না। সন্তান যদি মাকে আশ্রয় দেয়, খেতে দেয়, মায়ের আর চিন্তা থাকে না। মা সন্তানের ভালোবাসা ও সাহচর্যে স্বর্গ লাভ করে। স্বপ্নের গৌরবীর দেশ অনেক বড়ো। হারার মায়ের সাথে সেই দেশে যখন পৌঁছোয় তখন আনন্দের সীমা থাকে না। সেই আনন্দ গৌরবীর কাছে স্বর্গসুখ। গরিবের সীমিত চাহিদাপূরণ হলে তা স্বর্গসুখের সমান। দারিদ্র্যতার কোনো জাত-ধর্ম হয় না। ক্ষুধার কোনো রং নেই। খিদের জ্বালা সবারই এক।
ক্ষুধার্ত গৌরবী ও হারার মায়ের যে দৈনন্দিন কষ্ট, স্বর্গের দেশে গিয়ে তা যেন।এক হয়ে যায়।
প্রশ্ন:- “গৌরবীর শুকনো বুকে যেন কিসের ঢেউ লাগল।”—কোন্ ঢেউয়ের কথা বলা হয়েছে? গৌরবীর বুকে কীভাবে সেই ঢেউ লাগল তা বুঝিয়ে দাও।
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌরবী চিরন্তন মাতৃমূর্তির প্রতীক। নিজের সন্তান নিবারণ গৌরবীকে দূরে ঠেলে দিলেও তার হৃদয়ে মাতৃস্নেহের বিগলিত ধারা তাতে রুদ্ধ হয়নি। মা-হারা রুগ্ণ অসহায় হারাকে।কাছে পেয়ে গৌরবীর সেই মাতৃহৃদয়ের স্নেহধারা উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। হারার একটা কথায় গৌরবীর বুকে লুকোনো মাতৃস্নেহ ঢেউ-এর মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে গৌরবীকেই অভিভূত করেছে।
গৌরবীর নিজের অন্নের সংস্থান নেই, অন্যের দয়ায় তার আশ্রয়। অথচ মা হারা হারার প্রতি তার প্রবল মমত্ববোধ গরীবের গরীব হারাকে সে কীভাবে একটু আশ্রয় ও অন্ন দেবে তা নিয়ে
চিন্তার অন্ত নেই গৌরবীর। নিবারণের থেকে বিতাড়িত হয়ে গৌরবী যখন দিশেহারা তখন হারার মা তাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। তাই হারার মা-র প্রতি গৌরবীর কৃতজ্ঞতাবোধ প্রবল। গভীর চেতনায় ও মাতৃত্ববোধে এক দুঃখী তাই অনুভব করে আর-এক দুঃখীর দুঃখ। মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের অনুপ্রেরণায় অসহায় হারাকে আশ্রয় দেয় গৌরবী। যেটুকু খাবার ছিল তাই তুলে দেয় হারার মুখে। কিন্তু সমাজের অনুশাসনকে ভয় পায় গৌরবী। যদিও ধর্মীয় বেড়াজাল মাতৃত্বের স্নেহার্দ্রতাকে শুষে নিতে পারেনি। গৌরব নিরন্তর চেষ্টা করে হারার খাবারের সংস্থান করার জন্য। কিন্তু হয়ে ওঠে না।
হারার খাবারের চিন্তা করে গৌরবী যখন কূল পাচ্ছে না, সেইসময় একদিন অনেকবেলায় হারা একটা মেটে আলু নিয়ে এসে বলল যে, সেটা তাদের ঘরে ছিল, মা বলে গিয়েছিল ওটা মাসিকে দিতে। আরও বলল যে, মৃত্যুর আগে তার মা তাকে বলে গিয়েছিল যে, “মাসির পা ধরে থাকিস।” হারার এই কথাই গৌরবীর অন্তরে মাতৃস্নেহের, মায়ামমতার, করুণার বান ডাকে।
প্রশ্ন: “নিজেকে বড়ো প্রয়োজনীয় মনে হল হঠাৎ- কোন কথা শুনে কার এমন মনে হয়েছিল? এমন মনে হওয়ার কার কী?
উত্তর : যে কথায় যার নিজেকে প্রয়োজনীয় মনে করা গৌরবীর নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী হারার মা মারা যাওয়ায় নিঃস্ব, রিক্ত, অসহায় হারাকে নিয়ে নানা দুশ্চিন্তা হয় গৌরবীর। কিন্তু সামাজিক অনুশাসন এবং আশ্রয় ও অন্নের অনিশ্চয়তা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত গৌরবীর মাতৃহৃদয়। তবুও প্রত্যাখ্যান করতে পারে না হারাকে। বিশেষত হারা যখন বলে, তার মা মৃত্যুর আগে তাকে বলে গিয়েছিল, “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস।” তখন গৌরবীর মাতৃহৃদয় উদবেলিত হয়। নানা বাধানিষেধ ও প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও গৌরবীর প্রতি হারার মায়ের এই অনুগত্য তাকে মুহূর্তের মধ্যে প্রয়োজনীয় করে তুলেছিল।
কারণ : নিবারণের কাছে আশ্রয় না-পেয়ে গৌরবী যায় মেয়ে সাবিত্রীর (পুঁটি) কাছে; কিন্তু মেয়ের কাছে “গৌরবীর নিজেকে শুধুই এঁটো পাতা মনে হত,” মাকে দেখার মতো অবস্থা তার নেই। গৌরবীর এই দুঃসময়ে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছিল হারার মা।এক দুঃখী আর-এক দুঃখীর মন বুঝেছিল। কিন্তু হারাকে অনাথ করে দিয়ে চলে যাওয়ায় তার প্রতি রাগান্বিত হয়ে গৌরবী বলে, “কী বেআক্কেলে মানুষ বল,, কী অবিবেচক?” আবার হারা যখন একটা মেটে আলু এনে রান্না করার জন্য দেয়, তখন গৌরবীর মুখ হাসিতে ভরে যায়। সামান্য এটুকু দিয়েও সাহায্য করার কেউ নেই তার।
গৌরবীর মনটা বড়ো কোমল। সামান্য স্নেহ-মমতায়, মিষ্টি কথায়, আবেগে সে গলে যেতে পারে। নানা দুশ্চিন্তার মধ্যেও হারার মা-র কথাটা গৌরবীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, “মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস।” তার শুকনো বুকে যেন মাতৃত্বের বান ডেকে উঠেছিল। নিবারণ ও সাবিত্রী গৌরবীকে সারাজীবনের জন্য গুরুত্বহীন করে দিয়েছিল। গৌরবী ভেবেছিল, সে পঙ্গু হওয়ায় এবং সন্তানদের থেকে দূরে থাকায় তার জীবনটাই অর্থহীন; কিন্তু হারার কথা শুনে নিজের প্রতি বিশ্বাস ও গুরুত্ব বুঝতে পারে এবং নিজেকে বড়ো প্রয়োজনীয় মনে হয়।
প্রশ্ন : “গৌরবীর কথা শুনে ওর সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল।”— গৌরবীর কোন্ কথায় কার সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল। তার সর্বাঙ্গ জ্বলে যাওয়ার কারণ কী ?
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি’ ছোটোগল্প থেকে সর্বাঙ্গ জ্বলে যাওয়া কথা : আলোচ্য অংশটি গৃহীত। অসহায়, দুঃখিনী গৌরবীর নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী হারার মা মারা যাওয়ার পর অনাথ হারাকে নিয়ে নানা প্রতিকূলতা তৈরি হয়। একদিকে অন্নের সংস্থান ও আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে অসমর্থ গৌরবী, অন্যদিকে হারা মুসলমান হওয়ায় তার নিজের কাছে রাখার পক্ষে সমাজের রক্তচক্ষু। এই দুয়ের টানাপোড়েনে যখন মাতৃহৃদয় চঞ্চল তখন গৌরবীর মনে পড়ে যশির কথা। যশি প্রতিদিন শহরে যায়। তাই যশির সাহায্যে যদি হারার কোনো একটা ব্যবস্থা করা যায় সেই ভাবনা থেকে গৌরবী যশিকে কিছু একটা করার বন্দোবস্ত করতে বলে। যদিও বাস্তবের কঠোর অভিজ্ঞতায় দয়া-টরা দেখলে যশিদের অঙ্গ জ্বলে। হারার মতো অনাথ ও বিধর্মীর জন্য গৌরবীর এরকম ভাবনার কথা শুনে যশির সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল।
কারণ : অতি অল্পবয়স থেকে যশি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রীতিমতো সংগ্রাম করে জীবিকা অর্জন করছে। জীবনে কখনও সে কারও কাছে দয়া পায়নি। বিয়ের পর নারীর স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা যে স্বামীকে ঘিরে, সেখানেও যশি বঞ্চিত। যশির বর তাকে ভাত-কাপড় দেয় না, যশি
সে আশাও করে না। অক্লান্ত পরিশ্রম করে সংসার নামক কাঠামোটা মজবুত করে। এদের হৃদয় থেকে দয়া, মায়া, স্নেহ, করুণা, ভালোবাসা তাই অচিরেই হারিয়ে যায়। যশিরা “ছেলেপিলেকে জন্তুর মতো জাপটে ভালোবাসে আ স্বামীদের খুব তোয়াজ করে ভুলিয়ে রাখে।” তাই হারার প্রতি তার মমত্ববোধ না-জাগাটাই স্বাভাবিক। হারার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত গৌরবীকে যশি তাই
স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, “শহরে ছেড়ে দিতে পারি। ভিক্কে করে খাবে।”
যশির এমন অমানবিক মন্তব্যে গৌরবী আঁতকে ওঠে, দুশ্চিন্তা করে। হারার প্রতি এই প্রবল স্নেহবোধ দেখে যশির সর্বাঙ্গ জ্বলে যায়।
প্রশ্ন;/ “গৌরবীর ভেতরটা ভয়ে শুকিয়ে গেল।”— গৌরবীর ভয় পাওয়ার কারণ কী? ভয় কাটাতে সে কী করেছিল?
উত্তর : গৌরবীর ভয় পাওয়ার কারণ: মহাশ্বেতা দেবীর 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আজন্ম পঙ্গু গৌরবীকে হারার মা-র ওপর নির্ভর করেই বাঁচতে হয়। তার নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী সেই হারার মা হঠাৎ একদিন মারা যাওয়ায় অনাথ, অসহায়, দুঃখী হারা এসে দাঁড়ায় গৌরবীর উঠোনে আশ্রয় ও অন্নের আশায়। কিন্তু মুকুন্দের দয়ায় আশ্রিত গৌরবীর পক্ষে হারাকে অন্ন ও আশ্রয় দেওয়া সম্ভব ছিল না। তা ছাড়া হারার পাত আলাদা সে মুসলমান। কিন্তু মাতৃমমতায় ও অপত্যস্নেহে হারার জন্য তার চিন্তা হয়। গৌরবীর স্নেহময় মাতৃহৃদয়ে অসহায়, দুঃখী হারা কখন যেন সন্তানের স্থান দখল করে নেয়। সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গৌরবী। হারার জন্য যে কিছু করতে পারবে না, তা সে জানে; তাই যশিকে জানায় হারার কিছু একটা ব্যবস্থা করার জন্য। যদি বলে, “ওরে শহরে ছেড়ে দে আসি। বাঁচে মরে ও বুঝুক গা।” যশির এই নির্দয় মন্তব্যে গৌরবী কষ্ট পায়।
হারার প্রতি যশির সামান্যতম সহানুভূতিও নেই। মুকুন্দবাবু হারার কথা শুনলে হয়তো গৌরবীকে এই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। যশি তা মনে করিয়ে দিয়ে বলে, “মুকুন্দবাবু এই বাড়িতে মনসাঘট পুজো করলো ভাদ্দরে, পাঁঠা কাটল”।
যে বাড়িতে মনসাপুজো হয় সেখানে যে হারার মতো মুসলমান ছেলের প্রবেশ মুকুন্দবাবু সহ্য করবে না , যশি তা গৌরবীকে ভালোভাবে বুঝিয়ে গেল। আশ্রয়চ্যুত হওয়ার ভয়ে ঠিক তখনই গৌরবীর ভিতরটা যেন শুকিয়ে গেল। হারাকে বাঁচাতে গৌরবী নিবারণের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ভাবল, “নিবারণ যদি একটা বুদ্ধি দেয়”; হারার কথা শুনে যদি হারার একটা ব্যবস্থা করে। কিন্তু ফল হল উলটো। হারার কথা শোনার পর “নিবারণের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।” আসলে নিবারণ যে সমাজের শরিক সেই সমাজকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা তার নেই। নিবারণ তাই মাকে ‘ছোটোলোক' ও 'শত্রু' বলতে দ্বিধা করেনি। তারপর বলল “ও পাপ বিদেয় করো। তারপর ভেবে দেখব।” গৌরবী ছেলের এই নির্দয় মন্তব্যে রাজি হয় না। হারাকে নিয়ে অন্ধকারে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যায়।
প্রশ্ন:- “এমন ঘর সংসার সাজাল নিবারণ, তা সে ঘরে মায়ের জায়গা হয় না।”-নিবারণ কেমন ঘর-সংসার সাজিয়েছিল? সে ঘরে মায়ের জায়গা হয়নি কেন ?
উত্তর : নিবারণের ঘর-সংসার : মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের মাসি ছোটোগল্পে গৌরবীর ছেলে নিবারণ স্বার্থপর, হৃদয়হীন ও নিষ্ঠুর সমাজের প্রতিনিধি। নতুন ঘর তুলে, বিয়ে করেই নিবারণ মাকে পর করেছে। সামান্য সহানুভূতিও পায়নি গৌরবী নিবারণের কাছ থেকে। মায়ের প্রতি সে ছিল প্রতিহিংসাপরায়ণ। দুর্বিষহ যন্ত্রণা বুকে চেপে বহুদিন একা থাকার পর গৌরবী একবার নিবারণের কাছে গিয়েছিল হারার কিছু একটা ব্যবস্থা করার জন্য। কিন্তু ছেলের বাড়ি দেখে গৌরবী আর চিনতে পারে না। টিনের চাল, পাকা দেয়াল, উঠোনে বসেছে চাপাকল। অতি আশ্চর্যের বিষয়, নিবারণের ঘরে দেড়শো টাকা দামের রেডিও বাজছে, যা গৌরবী কখনও ভাবতেও পারেনি। গৌরবী অবাক হয়ে কান পেতে শোনে। নিবারণের তিন সন্তান এবং আর এক
সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায়। তার বউ সুপুরি কেটে অতিরিক্ত কিছু রোজগার করে। স্বামী-স্ত্রী পরিশ্রম করে মাকে ছাড়াই তারা নিজেদের মতো ঘর-সংসার সাজিয়ে তুলেছিল।
নিবারণের ঘরে জায়গা না-হওয়ার কারণ : বাসের কনডাক্টরকে জামাই করতে গিয়ে নিবারণের বাবা ঘর তৈরির টাকা ভেঙে ঘড়ি, সাইকেল, টর্চ কিনেছিল। নিবারণের বয়স তখন অনেক কম। সাইকেলটা দেখতে দেখতে সে বলেছিল, “সব একজনকে দিবি? তোমার একটা সন্তান?” গৌরবী বলেছিল, “তোর এত রিষ কেন? সময়ে পুঁটি আমায় ভাত দিবে।” নিবারণ সে-কথা ভুলে যায়নি। অনেক বছর ধরে সে চেষ্টা করে ঘর তুলে মেঝেটা পাকা করেছে। তারপর মায়ের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে।
প্রশ্ন: “দেখে নজর দিও না মা, নজর দিও না। দুই প্রাণী খেটে-খুটে এটুনি দাঁড় করিয়েছি।”–কে, কখন, কাকে এ কথা বলেছে? এই উক্তির মধ্য দিয়ে বক্তার চরিত্রের কী পরিচয় পাওয়া যায়?
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পে জাতপাত, অন্ধ-সংস্কার ও অমানবিক অনুশাসন কীভাবে গ্রামবাংলার
সাধারণ নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়কে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছিল লেখিকার বাস্তব।অভিজ্ঞতায় তা সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
বক্তা হলেন নিবারণের স্ত্রী। তিনি গৌরবীকে এই কথা বলেছেন।
গৌরবীর নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী হারার মা মারা যাওয়ার পর গৌরবী হারাকে নিজের কাছে আশ্রয় দেয়। কিন্তু সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মুসলমান হারাকে তার কাছে রাখার সাহস গৌরবীর নেই। মুসলমানের ছেলেকে ঠাই দেওয়ার অপরাধ সমাজ ক্ষমা করবে না। মুকুন্দ জানলে তার শেষ আশ্রয়টুকুও আর থাকবে না। হারার ভবিষ্যতের জন্য আকুল গৌরবী তাই নিবারণের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে ভাবে, নিবারণ হয়তো কিছু একটা উপায় বলে দেবে। ছেলের বাড়ি দেখে গৌরবী অবাক; আমূল পরিবর্তন হয়েছে, চিনতে পারে না গৌরবী। অবাক বিস্ময়ে দেখে নিবারণের ঘরবাড়ি, প্রাচুর্য, সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা সুন্দর সংসার। গৌরবীর বুকের গভীরে একটা চাপা মোচড় দেয়—ছেলের এমন সাজানো সংসারে মায়ের একটু জায়গা হয় না ! নিবারণের বউ সেই মুহূর্তে গৌরবীকে মর্মঘাতী আঘাতে আহত করে নির্লজ্জভাবে উক্তিটি ব্যক্ত করেছেন।
বক্তার চরিত্র: নিবারণ যে স্বার্থপর, হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর সমাজে বাস করে, তার বউ সেই সমাজেরই বাস্তব চরিত্র। সৌজন্য, মূলবোধ, মানবিক অনুভূতি কোনোকিছুরই স্থান নেই তার অন্তরে। নিবারণ মাকে আশ্রয় ও খেতে না-দিয়ে মায়ের প্রতি যেমন অবিচার করেছে, স্বামীর যোগ্য সহধর্মিণী হিসেবে তার বউও তাকে সঙ্গ দিয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক নিয়মে যে বৃদ্ধা ও পঙ্গু শাশুড়ী তার মাতৃসমা তাকে কদর্যভাবে বলেছে, “দেখে নজর দিয়ো না...।” আসলে নারীহৃদয়ের স্বাভাবিক কোমলতা ও অনুভূতি তার নেই। লেখিকা সূক্ষ্ম তুলির টানে এই স্বল্প-চরিত্রটির স্বরূপ নিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
প্রশ্ন: “মরলে মরবে। রোজ দিন হেথা-হোথা মানুষ মরছে না।”—উক্তিটির প্রসঙ্গসহ তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবীর 'হারুন সালেমের মাসি ছোটোগল্পের আলোচ্য অংশের বস্তা গৌরবীর ছেলে নিবারণ। নিবারণ এই নিষ্ঠুর অবিবেচক সমাজের স্বার্থপর ও অমানবিক চরিত্রের প্রতিনিধি।
প্রসঙ্গ : পিতৃ-মাতৃহীন অসহায় দুঃখী হারাকে নিয়ে আশ্রয় ও অন্নের অনিশ্চয়তায় বিপর্যন্ত গৌরবী ছেলে নিবারণের কাছে এসে কাতর স্বরে
অনুনয় করে বলেছিল, “তোর কাছে আমার একটু আশ্রয় দে বাবা।” নানা বিরূপ কথা বলার পর নিবারণ তার সামাজিক অবস্থানের কথা ভেবে হারা সম্পর্কে মাকে বলেছিল, “ও পাপ বিদেয় করো। তারপর ভেবে দেখব।”
গৌরবী ছেলের কথায় চিন্তিত ও মর্মাহত হলে নিবারণ হারার একটা ব্যবস্থ করার কথা বলে। যুদ্ধের সময় প্রতিদিন এদিকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা প্রচুর লোকের মাঝে হারাকে সে ছেড়ে দিয়ে আসতে চায়। গৌরবী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিল হারা যদি খেতে না-পায় তাহলে “মরে যাবে না?” গৌরবীর সেই কথার পরিপ্রেক্ষিতে নিবারণ এমন নিষ্ঠুর ও অমানবিক উত্তর দিয়েছিল।
তাৎপর্য : নিবারণের মতো স্বার্থপর, মানবিকবোধশূন্য চরিত্রের পক্ষে এই
উক্তি স্বাভাবিক। নতুন ঘর তুলে, ঘরের মেঝে পাকা করে মাকে ভাত দিতে সে অস্বীকার করেছে। বিয়ে করে নিজের সংসারের সুখের জন্য সে মাকে পর করে দিয়েছে। যে সন্তান মাকে ভাত দেয় না, হারার মতো মুসলমান সন্তানকে যে সে বাড়িতে ঠাঁই দেবে না সেটাই স্বাভাবিক। দুঃখী হারা ও তার মায়ের কথা শোনার পর নিবারণ তার মাকে বলেছিল, “তুমি নইলে এমন শত্রু আর কে হবে?" অসহায় হারার প্রতি সামান্যতম সহানুভূতি নিবারণের ছিল না। নিবারণ নিজে সন্তানের বাবা হলেও তার মধ্যে পিতৃত্বের স্নেহ ছিল না। তাই হারার প্রতি সে এতটা নির্দয় ও নিষ্ঠুর। হারাকে উদ্বাস্তুদের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে আসার কথা বলায় গৌরবী উৎকণ্ঠিতভাবে যখন জানতে চায় ওখানে হারা খেতে পাবে কিনা, তখন নিবারণ বলে, “ফেলে তো দিয়ে আসি। তা বাদে পেলে খাবে, না পেলে না খাবে।” হারার প্রাণ সংশয়ের
বিষয়ে গৌরবীর যে চিন্তা ও অস্থিরতা, নিবারণের মধ্যে তার সামান্যতম দেখা যায় না। বরং হারার প্রতি গৌরবীর এই ভাবনা তার হাসির খোরাক
জোগায়। নিবারণ এই নিষ্ঠুর সমাজের অমানবিক চরিত্রের প্রতিনিধি। তার পক্ষে তাই এমন উক্তি অস্বাভাবিক নয়।
প্রশ্ন: “হারা চোখ খুলল। নিমনিমে অন্ধকার, কে ওকে গায়ে হাত দিয়ে ঠেলছে আর ঠেলছে।” –কোন্ অবস্থায় হারার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে? কে, কীসের টানে হারার কাছে ছুটে এসেছে?
উত্তর : হারার অভিজ্ঞতা লাভের অবস্থার বর্ণনা : মানবদরদী জীবনশিল্পী মহাশ্বেতা দেবীর রচিত 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পের একটি বিশিষ্ট চরিত্র হারা। হারার মা মারা যাওয়ার পর হারাকে একটা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেওয়ার কথা ভেবেই ছেলে নিবারণের কাছে গিয়েছিল গৌরবী। নিবারণ মাকে আশ্রয় ও ভাত দিতে প্রথমে অস্বীকার করলেও কয়েকবছর পরে মাকে এই অসহায় অবস্থা দেখে ও সামাজিক সম্মানের কথা ভেবে তার মনে একট সহানুভূতি জেগেছিল। কিন্তু হারার পরিচয় জানার পর নিবারণ অন্য মূর্তি
ধারণ করে বলেছে, “ও পাপ বিদায় করো। তারপর ভেবে দেখব।” নিবারণ আরও বলে, উদ্বাস্তুদের মধ্যে হারাকে ছেড়ে দিয়ে আসবে, তারপর হারা বাঁচল কি মরল সে তার ভাগ্য। এসব শোনার পর হতাশায়, দুঃখে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে গৌরবী ফিরে আসে। ঠিক তার পরেই মুকুন্দ এসে গৌরবীকে জানিয়ে দেয় ভিন্ন জাতের হারাকে গৌরবী আশ্রয় নিয়েছে তার বাড়িতে, তাই গৌরবীকে তার বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। এই চরম সংকটের মধ্যে পড়ে গৌরবী হঠাৎ বিরূপ হয়ে ওঠে হারার প্রতি। হারার জন্য তার এই দুর্ভোগ। হারার প্রতি সহানুভূতি হারিয়ে রুক্ষ স্বরে হারার মৃত্যুকামনা করে গৌরবী। হারাক তাড়িয়ে দেয় ঘর থেকে। হারা মাসির সেই রূপ দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায় নিজেদের ঘরে। বসে বসে মার জন্য অনেকক্ষণ কেঁদে তারপর ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্নে তার মাকে দেখে। তারপর একসময় চোখ খুলে দেখে ঘরে অন্ধকার, সে টের পায় কেউ তার গায়ে হাত দিয়ে ঠেলেই যাচ্ছে।
★ গৌরবী হারাকে যে তাড়িয়ে দিয়েছে, হারার প্রতি এই বিরূপতা দেখিয়েছে, তা তার ছেলে নিবারণ এবং দূরসম্পর্কের আত্মীয় মুকুন্দের নিষ্ঠুর আচরণে তার মনে সৃষ্টি হওয়া গভীর যন্ত্রণা, দুঃখ, হতাশার জন্যই। গৌরবীর মনের স্বাভাবিক ধর্ম এমনটা নয়। ব্যক্তির, সমাজের একের-পর-এক হৃদয়হীন নিষ্ঠুর আচরণে দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যেও গৌরবীর মানবিক চেতনা নষ্ট হয়নি। প্রদীপ্ত মানবিকতাবোধ এবং মাতৃস্নেহ ভরা মায়া-মমতা-করুণঘন হৃদয়ের দীপশিখার প্রতিমূর্তি গৌরবী। অসহায় সন্তানের প্রতি কখনোই সে বিরূপ হয়ে থাকতে পারে না। আত্মিক অনুপ্রেরণায় গৌরবী ছুটে গেছে তাই হারার কাছে তাকে বুকে তুলে নিতে।
প্রশ্ন “গৌরবী আর হারা অন্ধকারে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেল।”—উক্তিটির প্রসঙ্গসহ তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর : প্রসঙ্গ : মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পটি গৌরবী ও হারার গল্প। মাত্র সাত বছর বয়সে মাতৃবিয়োগের পর অসহায়, নিঃস্ব,ছোট্ট হারা এসে দাঁড়ায় গৌরবীর উঠোনে। কঠোর সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা গৌরবীর পক্ষে হারার আশ্রয় ও অন্নের সংস্থান করা সম্ভব ছিল না। গৌরবী উদগ্রীব হয়ে কিছু একটা করার জন্য যশির কাছে পরামর্শ চায়। যশির স্পষ্ট কথা, “শহরে ছেড়ে দিতে পারি। ভিকে করে খাবে।” গৌরবীর মন সায় দেয় না। বাধ্য হয়ে গৌরবী যায় নিবারণের কাছে। নিবারণ সব শোনার পরে
অত্যন্ত নিম্নরুচির পরিচয় দিয়ে বলে, “ও পাপ বিদেয় করো। তারপর ভেবে দেখব।” নিবারণ হারাকে উদ্বাস্তুদের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে আসার কথা বললে গৌরবীর অন্তর কেঁদে ওঠে, “মরে যাবে না?” অন্যদিকে মুকুন্দ হারার কথা তুলে বলেছে গৌরবীকে তার ঘর ছেড়ে দিতে হবে। ধর্মে মুসলমান হওয়ায় হারার প্রতি এই সমাজ যে নিষ্ঠুর ও নির্মম ব্যবহার করেছে, সেই সমাজে গৌরবী আর না-থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে যেতে চেয়েছে।
তাৎপর্য : জাতপাত, অন্ধ অনুশাসন আর সংস্কারে কুটিল এই সমাজে মানবিকতার কোনো মূল্য নেই। পিতৃ-মাতৃহীন হারার অসহায়তা, দুঃখযন্ত্রণার প্রতি সামান্য সহানুভূতি নেই এই সমাজের। গৌরবী বুঝে গেছে এই স্বার্থপর, কুটিল, হিংস্র সমাজের সঙ্গে সংঘাতে শেষপর্যন্ত তার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এই পরিস্থিতিতে হারাকে বাঁচিয়ে রাখতে, বড়ো করে তুলতে গৌরবীকেও
বেঁচে থাকতে হবে। এমন একটা সমাজ খুঁজে বের করতে হবে গৌরবীকে, যেখানে জাত-ধর্ম-আচার-বিচারের শাসন নেই, অন্ধ অনুশাসনের জুলুম নেই—যে সমাজ সমুদ্রের মতো, মানুষ যেখানে স্বাধীন, মানবিকতা যেখানে বাধাবন্ধনহীন। রাতের অন্ধকারে গৌরবী হারাকে নিয়ে সেই সমাজের সন্ধানে শহরের উদ্দেশে যাত্রা করেছে।
প্রশ্ন:- “শহরে গৌরবী আর হারার সমাজ অনেক বড়ো। সমুদ্রে মতো।”–কে, কোন অবস্থায় শহরে যেতে চেয়েছে? শহরে যাওয়ার তাৎপর্য কী?
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গৌরবী মাতৃহারা হারাকে নিয়ে শহরে চলে যেতে চেয়েছে।
অবস্থার বর্ণনা : নিবারণের থেকে আশ্রয়চ্যুত হয়ে অসহায় গৌরবী দূরসম্পর্কের আত্মীয় মুকুন্দের দয়ায় একটা আশ্রয় পায়। কিন্তু একবেলা কীভাবে দুটো ভাত জোটাবে তা ভেবে পায় না। তার সেই চরম দুর্দিনে তারই মতো এক দুঃখিনী হারার মার সঙ্গে পরিচয় হয়। গৌরবীর নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী হারার মা তাকে বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। সেই হারার মা হঠাৎ একদিন মারা গেলে অত্যন্ত সমস্যার সম্মুখীন হয় গৌরবী। একদিকে নিজে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ভাবনা অন্যদিকে মা-হারা অনাথ হারাকে নিয়ে চিন্তা । হারার মা আয়েছা বিবি মারা যাওয়ার সময় হারাকে বলে গিয়েছিল, “মাসির পা পরে পড়ে থাকিস।” কিন্তু গৌরবীর নিজের অন্নের সংস্থান নেই, আশ্রয়টুকুও নিজের নয়—এই অবস্থায় হারার মুখে অন্ন জোগাবে কীভাবে! এ ছাড়া হারা জাতিতে মুসলমান। তাই তার সমাজ এটা মেনে নেবে না। তবুও হারার প্রতি প্রবল মাতৃত্ববোধ—গৌরবীর অন্তর তাকে ফিরে যেতে বলতে পারে না। গৌরবীর নিজের মধ্যে কোনো সামাজিক সংস্কার নেই। সে হারাকে ভালোবাসে নিজের সন্তানের মতো। কিন্তু সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে হারাকে সে আশ্রয় দিতে পারে না। নিবারণের কাছে গিয়েও কোনো সুরাহা হয় না। মাকে প্রত্যাখ্যান করে বলে, “ও পাপ বিদেয় করো, তারপর ভেবে দেখব।” গৌরবী এই নিষ্ঠুর কথা মেনে নিতে পারেনি। তাই মা-হারা হারাকে নিয়ে গৌরবী শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে চেয়েছে।
শহরে যাওয়ার কারণ : এই সমাজ ও সমাজের মানুষ হারাকে আশ্রয় দেবে না। হৃদয়হীন, স্বার্থপর, মানবিকবোধশূন্য, অবিবেচক এই সমাজে ।
গৌরবী হারাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। অথচ অপত্যস্নেহের বিগলিত ধারায় গৌরবীর মাতৃহৃদয় হারাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। কারণ সে শুধু মাসি নয়, কবে যেন গৌরবী হারার মা হয়ে গেছে। তাই সন্তানের মঙ্গলের জন্য গৌরবী শত দুঃখ-কষ্টকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, শারীরিক সমস্ত বাধা অগ্রাহ্য করে হারাকে বাঁচাতে ও বড়ো করতে শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে শহরের সমাজ অনেক বড়ো, ‘সমুদ্রের মতো'। সেখানে হারাকে নিয়ে গিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামে মিশে যাবে, “সেখানে একবার মিশে যেতে পারলে
আর কোনো ভয় থাকে না।” সেখানে জাতপাতের প্রশ্ন নেই, মুকুন্দবাবুর মতো ধর্মান্ধ মানুষ নেই; সেখানে আছে জাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শুধু মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম ।
প্রশ্ন:- ‘হারুন সালেমের মাসি' গল্পে 'মাসি'-র চরিত্রবৈশিষ্ট্যের যে পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে তা বিবৃত করো।
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবী তাঁর ‘হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পে জাতপাত, অন্ধ সামাজিক সংস্কারের ঊর্ধ্বে মানবতাবোধে দীপ্ত এবং চিরন্তন মাতৃহৃদয়ের মাহাত্ম্যে উজ্জ্বল নারী গৌরবীকে ‘মাসি’ হিসেবে রূপায়িত করেছেন। গৌরবী
এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
দুঃখিনী নারী : গ্রামবাংলার নিম্নশ্রেণি দরিদ্র পরিবারের এক দুঃখিনী নারী গৌরবী। শারীরিক অক্ষমতা, সমাজের নানা প্রতিকূলতা, মানুষের স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতা তার জীবনকে করেছে দুর্বিসহ। শারীরিক প্রতিকূলতার সঙ্গে একরকম লড়াই করলেও সামাজিক প্রতিকূলতা এবং অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা গৌরবীর কাছে অনেক কঠিন ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর শেষ জীবনের আশ্রয় ছেলে নিবারণ ভাত দিতে অস্বীকার করলে দূরসম্পর্কের আত্মীয় মুকুন্দের দয়ায় সে একটা অস্থায়ী আশ্রয় পায়। কিন্তু অন্নসংস্থানের কোনো উপায় করতে পারে না। খিদের জ্বালায় মাঝে মাজে মেটে আলু সেদ্ধ করে খেয়েছে।
মাতৃত্ববোধ : নিবারণ মাকে ত্যাগ করলে গৌরবী আঘাত পেয়েছে, কিন্তু সন্তানকে কোনো অভিশাপ দেয়নি। নিবারণের শূন্য জায়গা পূর্ণ করেছে হারা। রক্তের কোনো সম্পর্ক না-থাকলেও গৌরবী হারাকে দূরে ঠেলতে পারেনি। মা-হারা অসহায় হারাকে বাঁচাতে চেয়েছে ও তাকে অবলম্বন করে গৌরবী নিজেও বাঁচতে চেয়েছে। তাই সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মুসলমান হারাকে সঙ্গে নিয়ে শহরের ভিড়ে মিশে যেতে চেয়েছে গৌরবী। হারার জন্য তার মমত্ববোধ উজ্জ্বল থেকেছে।
জীবিকার জন্য লড়াই : গৌরবী তার দুর্বিসহ জীবনের সাথী হিসেবে পেয়েছিল হারার মাকে। হারার মা তাকে শিখিয়েছিল, তাদের মতো দরিদ্র দুঃখী মানুষদের সংগ্রাম করে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। হারার মা-র সাহায্যে খুঁতো পা টেনে টেনে গৌরবী ঝিল থেকে শাক, পাতা, গুগলি তুলেছে। নারকেল পাতা চেঁছে কাঠি বের করে তা দিয়ে কুস্তে বেঁধে যজ্ঞডুমুরের ডাল ভেঙে যশিদের কাছে দিয়ে সামান্য যা পেয়েছে তা দিয়ে কোনোমতে একবেলা করে চালিয়েছে। খিদের জ্বালায় গৌরবী মাঝে মাছে মেটে আলু, সেদ্ধ করেও খেয়েছে। জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে এভাবে তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে।
ব্যতিক্রমী নারী : এই স্বার্থপর, হৃদয়হীন, মানবিকবোধশূন্য মানুষের ভিড়ে গৌরবী আশ্চর্য এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। অবিবেচক সমাজের
অমানবিক অনুশাসনের ঊর্ধ্বে, জাতপাত, সংকীর্ণ সামাজিক বিধিনিষেধের ঊর্ধ্বে শুদ্ধ মানবিক চেতনায় সমৃদ্ধ এক মহান চরিত্রের গৌরব লাভ করেছে গৌরবী। তার এই মানবিক মাহাত্ম্যকে গভীরতম তাৎপর্যমণ্ডিত করেছে নারীর
স্নেহ-মায়া-মমতা। মা-হারা দুঃখী হারার মা হয়ে গৌরবী জগতের সমস্ত সহায়সম্বলহীন, অনাথ, দুঃখীর জননী হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন: ‘হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্প অবলম্বনে যশি চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবী রচিত 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি নারীচরিত্র যশি। গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াতের সুবাদে লেখিকা নিম্নশ্রেণির মানুষের জীবন ও তাদের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাঁর চোখে দেখা সেই অভিজ্ঞতার ফসল যশির মতো চরিত্র।
জীবন সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা : নিম্নবিত্ত সমাজের বাস্তব ও জীবন্ত চরিত্র যশি। যশির নাকটা চাপা কিন্তু মুখটা বেশ পানপাতার মতো হরতনি ছাঁচের। চোখ দুটো সর্বদা এদিক থেকে ওদিক ঘোরে। যশির চোখ এড়িয়ে যাওয়া খুব কঠিন। কঠোর জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে যশিদের জীবন অতিবাহিত হয়। জীবনের রুহু, কঠিন, দয়ামায়াহীন, নগ্ন বাস্তব রূপটা তাই সে খুব ভালো করেই চেনে। যশিদের সমাজে পুরুষরা কোনোদিন মেয়েদের ভাত-কাপড় দেয় না। তারা আশাও করে না। যশির বরও যশিকে সেসব দেয় না। সাত বছর বয়স থেকে সে খাটছে। ট্রেনে একটু বসার জায়গার জন্য, চাল বেচে লাভের পয়সা আদায়ের জন্য তাকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। তাই দয়ামায়া দেখলে যশির অঙ্গ জ্বলে।
*
জীবন সংগ্রামী নারী : যশিরা শরীরে খেটে সংসার গড়ে তোলে। স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখতে ও ছেলেপুলেদের মুখে অন্ন তুলে দিতে তাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। তাই তাদের মন থেকে স্নেহ, দয়া, মায়া, মমতা, করুণা — হৃদয়ের সুক্ষ্ম সুকুমার প্রবৃত্তিগুলি অচিরেই হারিয়ে যায়। বেঁচে থাকার লড়াই করতে করতে তারা জীবনকে টিকিয়ে রাখে। জীবন বলতে সে শুধু বোঝে জৈবিক জীবন—যে জীবনে অনুভূতি নেই, জীবনজিজ্ঞাসা নেই। খেয়ে পরে বেঁচে থাকাটাই তার কাছে জীবন।
স্পষ্টবাদী : যশি যে সমাজে বাস করে সেখানে সামাজিক অনুশাসনের ঊর্ধ্বে ওঠার সামর্থ্য তার নেই। তাই হারার জন্য গৌরবীর দুশ্চিন্তা তার মনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলে না। সে গৌরবীর অন্তরের মমত্ব কখনও উপলব্ধি করেনি। তাই অনায়াসে বলতে পারে, “তোমার মাসির ভীমরতি। ভিক্কে করে খাবে খাবে, না খাবে না খাবে, তোমার কি, আমার কি?” যশি যে জীবনের শরিক তাতে যশির এই মানসিকতা সংগত ও স্বাভাবিক। গৌরবীর পাশাপাশি বশির চরিত্রচিত্রণে লেখিকা গভীর জীবন-অভিজ্ঞাতারই পরিচয় দিয়েছেন।
প্রশ্ন :- ‘হারুন সালেমের মাসি' গল্প অনুসরণে নিবারণ চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবীর ‘হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পে হারার প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে আলোচ্য মন্তব্যটি করেছে নিবারণ। গল্পের পার্শ্বচরিত্র হিসেবে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। গল্প-মধ্যে তার চরিত্রের যে বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে সেগুলি হল—
আত্মকেন্দ্রিক : স্বামী মারা যাওয়ার পর শারীরিকভাবে পঙ্গু গৌরবী নিবারণকে অবলম্বন করেই বাঁচতে চেয়েছে। কিন্তু নিবারণ প্রকৃত মানুষ হয়নি। সে এই সমাজের একটি টাইপ চরিত্রে পরিণত হয়েছে। সে আত্মকেন্দ্রিক, ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির। গৌরবীর হৃদয়ের মমত্ব নিবারণ পায়নি। তার অন্তর রুক্ষ, শুষ্ক ও কঠোর। গ্রামবাংলায় স্বামীহারা স্ত্রীদের শেষ আশ্রয় হয় সন্তান। কিন্তু গৌরবী সন্তানের কাছে আশ্রয় পায়নি।
অমানবিক- মাকে আশ্রযচ্যুত করতে তার বিবেকের দংশন হয়নি। নতুন ঘর তুলে, ঘরের মেঝে পাকা করে তারপর বিয়ে করেই নিজের সংসারের সুখের জন্য সামান্য অজুহাতে সে মাকে পর করে দিয়েছে। মানবিকবোধশূন্য হয়ে সে মাকে ভাত দিতে অস্বীকার করেছে।
বিবেকের হীন : নিবারণ আসলে সম্পূর্ণভাবেই বিবেকহীন একটি চরিত্র। মা কোথায় আশ্রয় পেল, কীভাবে তার অন্নের সংস্থান হল, একবেলাও তার খাবার জোটে কিনা, শারীরিকভাবে অক্ষম মা কেমনভাবে বেঁচে আছে—কোনো খবরই নেয়নি নিবারণ। হারাকে সঙ্গে নিয়ে আশ্রয়ের আশায় গৌরবী একবার নিবারণকে বলেছিল “তোর কাছে আমায় একটু আশ্রয় দে বাবা!” মায়ের এই করুণ আবেদনে নিবারণ নিষ্ঠুরভাবে বলেছে “ও! আমি জমিদার তাই তোমায় আশ্রয় দেব।” তারপর নিজের বর্তমান সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও সম্মানের কথা ভেবে বলেছে—“তবে হ্যাঁ। এখন সমাজে আমার একটু নাম হয়েছে। আমার মা হয়ে ওই অজ গাঁয়ে পড়ে থাকবে সেটা ভালো দেখায় না
বটে।” মাকে আশ্রয় দেওয়ার ইচ্ছার মধ্যে কোনো মানবিকবোধের প্রেরণা নেই; তার স্বার্থবুদ্ধি ও সামাজিক সম্মান রক্ষার তাগিদ প্রকাশ পেয়েছে।
সমাজবিধির অনুগামী : নিবারণের মতো চরিত্ররা সামাজিক বিধি, অন্ধ-অনুশাসন, অবিবেচক সমাজের মানবিকবোধশূন্য রীতিনীতি, জাতপাত, বিচারপ্রথার প্রতি যে অবিচল নিষ্ঠা প্রকাশ করবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। সামাজিক জাতপাতের উর্ধ্বে ওঠা তার পক্ষে সম্ভবও নয়। তাই হারার জাতের পরিচয় পেয়ে নিবারণ মাকে বলেছে—“তুমি নইলে এমন শত্রু আর কে হবে?” নিবারণ তার এবং মায়ের প্রায়শ্চিত্তের কথা ভেবেছে। তারপর মাকে বলেছে হারাকে যদি বিদায় করতে পারে তাহলে মাকে আশ্রয় দেওয়ার কথা চিন্তা করবে। মা-হারা দুঃখী হারার প্রতি সামান্য সহানুভূতিও তার নেই।
নির্লজ্জ্বতায় ভরা: সে সম্পূর্ণ নিলজ্জ চরিত্রের পরিচয় দিয়েছে হারাকে অসহায় উদ্বাস্তুদের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে আসতে চেয়ে এবং “মরলে মরবে। রোজদিন হেথা-হোথা মানুষ মরছে না।”—এই কথা বলে। স্বার্থপর, আত্মসুখসর্বস্ব, মানবিকতাবোধশূন্য হৃদয়হীন এই চরিত্রসৃষ্টির মধ্য দিয়ে মহাশ্বেতা দেবী তাঁর প্রখর জীবন অভিজ্ঞতা
ও সুগভীর জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন।
প্রশ্ন: ‘হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর : উত্তরের জন্য 'নামকরণ' অংশ দেখো।
প্রশ্ন: ‘হারুন সালেমের মাসি গল্পে সমাজের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তার পরিচয় দাও।
উত্তর : মহাশ্বেতা দেবী নানা সমাজসেবকমূলক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকার গ্রামবাংলার সমাজ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা প্রচুর। সেই অভিজ্ঞতার পরিচয় সুস্পষ্ট হয়েছে তাঁর 'হারুন সালেমের মাসি' ছোটোগল্পে। এই গল্পে বাংলার গ্রামের এবং গ্রাম্য সমাজের নিম্নশ্রেণি মানুষের জীবন ও তাদের জীবনযাত্রা,সামাজিক পরিবেশ ইত্যাদি অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে পরিস্ফুট হয়েছে।
মায়ের প্রতি প্রতিহিংসা : স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর শেষ আশ্রয় হয় তার সন্তান। কিন্তু গৌরবী তার সন্তানের কাছে আশ্রয় পায়নি। গৌরবীর ছেলে
নিবারণ তেমন অভাবী না-হওয়া সত্ত্বেও প্রতিহিংসাবশত মাকে ভাত দিতে রাজি হয়নি। শুধু বাংলা বা নিম্নশ্রেণির নয়, বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সারা বাংলারই বাস্তব চিত্র এটি।
সমাজে বেঁচে থাকার লড়াই : অসহায় অবস্থায় গৌরবী মেয়ের কাছেও নিশ্চিত আশ্রয় না-পেয়ে লোকের বাড়িতে কাজ করে দিন গুজরান করেছে। তারপর দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের দয়ায় এবং হারার মায়ের সহযোগিতায় নারকেল পাতা চেঁছে, কাঠি দিয়ে কুস্তে বেঁধে; শাক, গুগলি
তুলে; যজ্ঞডুমুরের ডাল ভেঙে যে-কোনো প্রকারে জীবনসংগ্রাম করে বেঁচে থেকেছে। পল্লিবাংলায় এমন স্বামীহারা নারীদের সন্তানদের থেকে অবস্থা, অবহেলায় চরম অসহায় হয়ে ঘোর দারিদ্র্য দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয়। অথচ এই নারীরাই স্নেহ-মায়া-মমতাকে ধারণ করে রাখে বুকের মধ্যে। নিবারণ মায়ের প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য বা সহানুভূতি না-দেখালেও কিংবা ভা ও আশ্রয় দিতে অস্বীকার করলেও গৌরবী সন্তানকে কোনো অভিশাপ দেয়নি বা কটূ কথা বলেনি। এই দুঃখযন্ত্রণাকে সে দুর্ভাগ্য বলে নীরবে মেনে নিয়েছে সমাজের রক্তচক্ষু ও মানবিক মূল্যবোধ : জাতপাত, অন্ধ-অনুশাসন আর সংস্কারে কুটিল এই সমাজে মানবিকতার কোনো মূল্য নেই। পিতৃমাতৃহী হারার অসহায়তা ও দুঃখযন্ত্রণার প্রতি সামান্যও সহানুভূতি নেই এই সমাজের হারার জাত-ধর্ম দিয়ে তাকে বিচার করা হয়। এই সমাজের রক্তচক্ষু থেকে হারাকে বাঁচাতে বারবার গৌরবীকে মিথ্যে কথা বলতে হয়েছে। জাতপাত, সংস্কার-আচারধর্মের অনেক ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক মূল্যবোধকে সে রাখতে পেরেছে। যদিও গৌরবী জানে, এই সমাজের সঙ্গে সংঘাতে শেষপর্যন্ত তার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। হারাকে বাঁচিয়ে রাখতে ও বড়ো করে তুলতে গৌরবিকে এমন একটা সমাজ খুঁজে বের করতে হবে যেখানে জাত-ধর্ম-আচার-বিচারের শাসন নেই, অন্ধ-অনুশাসনের জুলুম নেই–যে সমাজ সমুদ্রের মতো, মানুষ যেখানে স্বাধীন, মানবিকতা যেখানে বাধা-বন্ধনহীন। তাই রাতের অন্ধকারে গৌরবী হারাকে নিয়ে সেই সমাজের সন্ধানে শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে।
কয়েকজন লোক এসে আয়েছা বিবিকে নিয়ে গেল কবরস্থানে। গৌরবী হারাকে সঙ্গে যেতে বলল মাটি দেওয়ার জন্য। সেদিনই বিকেলের পড়ন্ত আলোয় যজ্ঞডুমুরের
ডাল ভাঙতে ভাঙতে নিঃসঙ্গ গৌরবী নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তার মনে হয়েছিল, “আমি বা কোথায় মরব, সে মুখশলা করবে কে জানে!” এসব কথা ভাবার সময়ে গৌরবীর বড়ো কষ্ট হয়।
উদ্দিষ্ট সময়ে গৌরবীর কষ্টের কারণ : নিবারণের আর্থিক অবস্থা তখন ভালোই, নতুন ঘর তুলেছে, ঘরের মেঝে পাকা করেছে, বিয়েও করেছে- কিন্তু তার সেই সুখের সংসারে মায়ের জায়গা হয়নি। তার একটুও সংকোচ হয়নি, একটুও বিবেকের দংশন অনুভব করেনি মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য। বরং এ কথা বলতে শোনা গেছে, “এবার পুঁটির কাছে যাও
গিয়া। মাঝে মধ্যে আমি খবর দিব।” মেয়ের কাছে গিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। বুকের ভিতর অনেক যন্ত্রণা ও অভিমান নিয়ে মুকুন্দের দয়ায় তাই
গৌরবীকে বেঁচে থাকতে হয়। দারিদ্র্য, বঞ্ছনা, অবহেলা, সমাজের অন্ধ-অনুশাসন গৌরবীর জীবনকে করেছে পঙ্গু, যা তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার চেয়ে অনেক বেশি দুর্বিষহ। এমন যন্ত্রণাময় জীবনের একমাত্র সঙ্গী হারার মা মারা যাওয়ার পর হারার হাতের মাটি পেয়েছে, নিজের ঘরে শুয়ে মরেছে। হারার মা তাই ভাগ্যবতী। গৌরবীর তেমন সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় আছে ভেবেই মন মনে সে কষ্ট,অনুভব করে।
