পঞ্চতন্ত্রের বাছাই গল্প কেউটে কাক ও সোনার হার এবং বক ও কাঁকড়া
![]() |
পঞ্চতন্ত্রের গল্প
কেউটে, কাক ও সোনার হার
এক বনের মধ্যে বিশাল একটা বটগাছে বাসা বেঁধেছিল এক কাক পরিবার। গাছে তলায় এক সরু লম্বা কোটরে থাকত এক কেউটে সাপ। ওই কেউটে সাপটা প্রতিবারই কাকের ডিম ফেটে ছানা বেরোলেই খেয়ে ফেলত। মা-কাক মনের দুঃখে চোখের জল ফেলত। বাবা-কাকও রাগে দুঃখে সাপকে শাস্তি দেবার কথা ভাবত। তারা বুঝে উঠতে পারত না কীভাবে তারা সাপকে শাস্তি দেবে।
এই কাক দুটোর খুব বন্ধুত্ব ছিল এক শিয়ালের সঙ্গে। এই বিপদের দিনে তারা ভাবল যে তাদের শিয়াল বন্ধু অবশ্যই তাদের একটা উপায় বলে দেবে। দুজনে মিলে উড়ে গেল শিয়ালের কাছে।
শিয়াল অনেকক্ষণ চিন্তা করে বলল, শোনো ভাই, সাপকে জব্দ করার জন্য আমি একটা ফন্দি এঁটেছি। আগামীকাল সকালে রাজবাড়ির মেয়েরা যাবে নদীতে স্নান করতে।
তারা নদীর তীরে কাপড় চোপড় গয়নাগাঁটি রেখে স্নান করতে নামবে। ওই সময় তুমি হার অথবা অন্য যে-কোনো মূল্যবান জিনিস তুলে নিয়ে কেউটের কোটরে এনে ফেলে দেবে। এরপর দেখবে কেউটে কীভাবে জব্দ হয়।
শিয়ালের পরামর্শ মতো রাজবাড়ির মেয়েরা যখন নদীর তীরে কাপড় চোপড় ও গয়নাগাঁটি রেখে স্নান করতে নদীতে গেল, তখন কাক এসে সেখানে উপস্থিত হল। সেখান থেকে একটি সোনার হার তুলে নিয়ে কাক উড়ে পালিয়ে গেল। রাজবাড়ির প্রহরীরা কাককে অনুসরণ করে লাঠি হাতে ছুটে চলল। কাকটি হার নিয়ে কেউটের গর্তে দিল ফেলে।
বটগাছের কোটরের সামনে গিয়ে প্রহরীরা লাঠি নিয়ে হারটি খুঁজতে লাগল। কেউটে রেগে গিয়ে ফণা তুলে বেরিয়ে আসতেই প্রহরীরা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সাপটিকে মেরে ফেলল। তারপর তারা মনের আনন্দে সোনার হারটি নিয়ে রাজবাড়ির দিকে রওনা হল। কাক দুটো কেউটের মৃত্যুতে খুবই আনন্দিত হল এবং বন্ধু শিয়ালের কাছে চিরকৃতজ্ঞ রইল।
■■■■■
বক ও কাঁকড়া
এক বিশাল বনের মধ্যে ছিল। একটা বড়ো জলাশয়। জলাশয়টি গভীর হওয়ার জন্য দু-চার বছর বৃষ্টি না হলেও জলাশয়ের জল শুকোত না। বিভিন্ন মাছ, শামুক, কাঁকড়া, ঝিনুকের বাস ছিল এই জলাশয়ে। জলাশয়টির তীরে ছিল ছোটো বড়ো নানান মাপের বিভিন্ন গাছ। এই সব গাছে বাস করত বহু বক। হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে থাকত এই সব বক। সুযোগ পেলেই মাছ, ব্যাঙ, শামুক খেয়ে ফেলত বকেরা। জলাশয়ের কোনো প্রাণীরও নিস্তার ছিল না বকেদের হাত থেকে।
এক বুড়ো বক ছিল বকেদের এই দলে। শরীরে ক্ষমতা না থাকার জন্য খাবার জোগাড় করার ক্ষমতা ছিল না তার। অথচ খাবার না পেলে তো মরতে হবে। অনেক চিন্তা করে সে বার করল এক মতলব।
বুড়ো বকটি একদিন জলাশয়ের ধারে বসে কাঁদতে লাগল। এক কাঁকড়া বককে এভাবে।দেখে বলল, বকমামা কাঁদো কেন? তুমি কি খাবার জোগাড় করতে পারোনি?
না না আহার আমি ত্যাগ করেছি। এই জীবনে আর মাছ খাব না। এই আমার ব্রত।
কাঁকড়া বলে উঠল-সে কী মামা হঠাৎ এই ব্রতের কারণ কী?
বুড়ো বক বলল, বারো বছর এই এলাকায় জল হবে না, ফলে শুকিয়ে কাঠ হবে সব নদীনালা জলাশয়।
ভয়ে কাঁকড়া বলল, সে কী মামা, তাহলে তো আমাদের মারা পড়তে হবে। এই ভয়ংকর খবর তুমি কীভাবে জানলে মামা?
দৈববাণী শুনেছি আমি— বক বলে উঠল। এতদিন আমি তোমাদের সঙ্গে কাটিয়েছি। জলের অভাবে বেঘোরে প্রাণ যাবে তোমাদের, এ কথা ভেবেই আমার এত কষ্ট। কাঁকড়া গিয়ে সব জলচর, প্রাণীদের এই খবর দিতেই সকলে ছুটে এল বকের কাছে।
বককে বলল, মামা, তুমি অনেক অভিজ্ঞ। আমাদের বাঁচার একটা উপায় বলো। বেশ দূরে একটা গভীর জলাশয় আছে। তোমরা সেখানে গেলে সকলেই প্রাণে বাঁচবে। পরামর্শ দিল বক।
হতাশ মাছেরা বলল, আমাদের তো ডানা নেই, কীভাবে যাব আমরা।
আমি তোমাদের পিঠে করে জলাশয়ে নিয়ে যাব। এক একদিন একজন করে যাবে আমার পিঠে চড়ে।
মহানন্দে নেচে উঠল সকলে। বক একটা করে মাছ নিয়ে যায়। পাথরের ওপর আছড়ে মেরে খেয়ে ফেলে। এইভাবেই মহাসুখে কাটতে লাগল বকের দিন।
কাঁকড়া একদিন এসে বলল, মামা – তুমি সকলকেই নিয়ে গেলে, পড়ে রইলাম আমি। কবে আমাকে নিয়ে যাবে ওই জলাশয়ে?
মাছ খেয়ে খেয়ে বকের অরুচি ধরে গিয়েছিল। খুশি হয়ে তাই সে বলল, সত্যিই তো ভারি অন্যায়। আজ অবশ্যই নিয়ে যাব তোমাকে।
বকের পিঠে চড়ে কাঁকড়া তার যাত্রা শুরু করল। কিছুদূর গিয়েই কাঁকড়া দেখল, বড়ো একটা পাথরের গায়ে মাছের কাঁটা ও লাল দাগ। ভয়ে কাঠ হয়ে কাঁকড়া বলল,জলাশয় আর কতদূরে মামা?
কাঁকড়াকেও পাথরের কাছে নিয়ে গেল বক। বলল, দাঁড়া ব্যাটা, জলাশয়ে যাবি, চিন্তা করিস না। আমিই জলাশয়, তোকে সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি খুব শিগগির।
বুদ্ধিমান কাঁকড়া বকের শয়তানি বুদ্ধি বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গেই তার ধারালো দাঁড়া দিয়ে বকের সরু গলা ধরল চেপে। মুহুর্তের মধ্যেই মারা গেল বক।
■■■■■
