পঞ্চতন্ত্রের দুটি বাছাই গল্প হাতি ও চড়ুইনি এবং কচ্ছপ ও রাজহাঁস
কচ্ছপ ও রাজহাঁস
এক সরোবরে একটা কচ্ছপ ও দুটো রাজহাঁস বাস করত। তিনজনের মধ্যে ছিল খুব বন্ধুত্ব। মনের আনন্দে তারা সময় কাটাত। সেই দেশে একবার অনেকদিন বৃষ্টি না হওয়ার জন্য নদী, সরোবর সব শুকিয়ে যেতে লাগল। পাখিরা বাঁচার আশায় নিরাপদ জায়গায় উড়ে চলে যেতে লাগল।। রাজহাঁস দুটো বিপদের কথা চিন্তা করে নিরাপদ জায়গায় উড়ে যাবার কথা চিন্তা করল। তারা যখন তাদের বন্ধু কচ্ছপের কাছে বিদায় নিতে গেল, তখন কচ্ছপ বলল, 'আমাকেও তোমরা তোমাদের সঙ্গে নিয়ে চলো।'
রাজহাঁসেরা বলল, কীভাবে তুমি আমাদের সাথে যাবে? তুমি তো ভাই আমাদের মতো উড়তে পারো না।
কচ্ছপ বলল, 'এটা তো খুবই সহজ কাজ। একটা লাঠি তোমরা এনে দাও। সেই লাঠির মাঝখানটা দাঁত দিয়ে আমি কামড়ে ধরব। আর তোমরা ঠোঁট দিয়ে লাঠির দুদিক ধরে থাকবে এবং আমি তোমাদের সঙ্গে উড়ে যাব।'
রাজহাঁসরা কাচ্ছপের এই প্রস্তাবে রাজি হল কিন্তু কচ্ছপকে সাবধান করল- 'দেখো ভাই, উড়ে যাবার সময় তুমি ভুলেও মুখ খুলবে না। মুখ খুললেই তুমি লাঠি থেকে মাটিতে পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই মারা যাবে।'
কচ্ছপ বলল, না না তোমরা চিন্তা কোরো না। আমি কখনো এই ধরনের বোকামি করব না। আমি একদম চুপচাপ থাকব। পরের দিন সকালে রাজহাঁস দুটি তাদের বন্ধু কচ্ছপকে নিয়ে উড়ে চলল মাঠের ওপর দিয়ে। রাজহাঁসেরা লাঠির দুপাশ ধরেছিল আর কচ্ছপ সেই লাঠির মাঝখানটা দাঁত দিয়ে শক্ত করে কামড়ে ধরল। অনেক মাঠ ও পাহাড় পেরিয়ে তারা যাচ্ছিল শহরের ওপর দিয়ে উড়ে। শহরের লোকেরা এরকম অবাক দৃশ্য কখনো দেখেনি। তারা চিৎকার করে বলল, 'কী অদ্ভূত ব্যাপার! একটা কচ্ছপকে লাঠির মাঝখানে নিয়ে দুটো পাখি উড়ে যাচ্ছে। ভারি মজার ব্যাপার তাই না।' কচ্ছপকটাকে পেলে মাংস করে খাওয়া যায়। শহুরে লোকেদের চেঁচামেচি শুনে কচ্ছপের খুব রাগ হল। খানিকক্ষণ রাগ চেপে রইলেও বার বার এক কথা শুনে রেগে গিয়ে সে বলল, 'বোকাদের দল, ছাই খা তোরা।' কথা শেষ হওয়ার আগেই কচ্ছপটি লাঠি থেকে খসে মাটিতে পড়ে গেল এবং অবশেষে মারা গেল।
■■■■■
হাতি ও চড়ুইনি
এক বনের মধ্যে একটা গাছে বাসা বেঁধে বাস করত একজোড়া চড়ুই পাখি। বেশ সুখেই দিন কাটছিল তাদের। একদিন চড়ুই গিন্নি কয়েকটি ডিম পাড়ল। মনের আনন্দে তারা বাচ্চা হবার আশায় দিন গুণছিল।
হঠাৎ একদিন ঘটল একটি দুর্ঘটনা। একটি বুনো হাতি গরমে অস্থির হয়ে বনবাদাড় দাপিয়ে ছুটে যাচ্ছিল। চড়ুই চড়ুইনির বাসার তলা দিয়ে যাবার সময় সব ডালপালা ভেঙে ফেলল হাতি তার শুঁড় দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গেই ডিমগুলো পড়ে গেল বাসা থেকে এবং ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।.
পাগলের মতো কেঁদে উঠল চড়ুইনি। এই সময় ছুটে এল তাদের প্রাণের বন্ধু
কাঠঠোকরা। বন্ধুকে সান্ত্বনা দিল কাঠঠোকরা— 'ভেঙে পড়ো না, শোক সামলাও।
চড়ুইনি বলল, ‘আমার সন্তানদের মৃত্যু আমি ভুলতে পারছি না।' যেভাবেই হোক এই শয়তান হাতিটাকে শাস্তি দিতে হবে, তবেই মনের শান্তি হবে।
কাঠঠোকরা তাকে বলল, তার এক মাছি বন্ধুর কথা। বীণারব নামে এই বন্ধুই বিপদের দিনে তাকে সাহায্য করবে। বীণারবকে চড়ুইনির এই বিপদের কথা বলাতে হাতিকে মারার জন্য সে তাঁদের ব্যাঙ বন্ধু মেঘনাদের সাহায্য নেওয়ার কথা বলে।
ব্যাঙের কাছে যাবার পর সকলে মিলে আলাপ আলোচনা করে হাতিকে মারার একটা উপায় বের করল।
ঠিক করা হল, হাতি যখন বিশ্রাম করবে, মাছি গিয়ে তখন গান করে ঘুম পাড়াবে।
কাঠঠোকরা তখন তার লম্বা ঠোঁট বিধিয়ে হাতির চোখ অন্ধ করে দেবে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে হাতি জলের কাছে যেতে চাইবে। ব্যাঙ তখন তার দলবল নিয়ে কাছেই কোনো গর্তের ধারে থাকবে বসে। জলাশয় ভেবে সেদিকে ছুটতে গিয়ে গর্তে পড়ে মৃত্যু হবে হাতির।
পরিকল্পনা অনুযায়ী পরের দিন হাতির বিশ্রামের সময় মাছি গান শুনিয়ে তাকে আরামে চোখ বুজতে দিল। কাঠঠোকরা গিয়ে ওই সময় দিল তার চোখ অন্ধ করে।
যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে জলাশয়ের খোঁজে যাবার সময় যে গর্তের কাছে ব্যাঙ ও তার দলবল বসেছিল সেখানেই গড়িয়ে পড়ে মারা গেল হাতি। সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতায় হাতির মৃত্যুতে সন্তানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পেরে খুশি হল চড়ুই ও চড়ুইনি।