পঞ্চতন্ত্রের একটি গল্প হাতি ও ইঁদুরের কথা
![]() |
হাতি ও ইঁদুরের কথা
অনেকদিন আগে মস্ত বড়ো এক শহর ছিল। ঝিলের ধারে অবস্থিত এই শহরটি ছিল ছবির মতো সাজানো। শহরে ছিল অনেক সুন্দর বাড়ি ও মন্দির।
এই শহরের লোকেরা ছিল খুব সুখী। বহুদিন পর শহরটা আর সুন্দর থাকল না, একটা ধ্বংসস্তূপের আকার নিল।
শহরটা ধ্বংস হওয়ার জন্য শহরের বাসিন্দারা অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিল। তাদের সঙ্গে তারা তাদের গোরু, ঘোড়াদের নিয়ে গিয়েছিল। শহরে একমাত্র পড়ে থাকল ইঁদুরের দল।
ইঁদুররা মহাসুখে সেই শহরে বাস করতে লাগল। এখন এটা একটা ইঁদুর নগরী।
ইঁদুরদের পরিবার, তাদের আত্মীয়স্বজন সেই শহরের মনের আনন্দে বাস করতে থাকল। ইঁদুরের মামা, কাকা, ভাই বোন, কর্তা-গিন্নী সকলেই এই শহরের আনাচে কানাচে সুখে বাস করে। তারা আবার এই শহরে বিভিন্ন রকম উৎসব পালন করে। ইঁদুররা বসন্ত উৎসব, ধান কাটার উৎসব এইসব নিয়ে প্রায় ব্যস্ত থাকত। জীবনে দুঃখ বলে কোনো কিছু তাদের ছিল না। তাদের জীবন ছিল সুখের সাগর।
ইঁদুররা যে শহরে বাস করত সেখান থেকে বেশ কিছু দূরের একটা জঙ্গলে একদল হাতি বাস করত।
এই হাতিদের রাজা ছিল খুব ভালো ও দয়ালু স্বভাবের। দলের অন্যান্য হাতিদের সে সবসময় খেয়াল রাখত। তাদের বিপদে আপদে সে সবসময় হাতিদের রক্ষা করত।
গজরাজের এই সুন্দর স্বভাবের জন্য সব হাতিরা তাকে ভালোবাসত ও মনের আনন্দে একসঙ্গে বাস করত।
একবার এই হাতিরা মহাবিপদে পড়ল। বহু বছর ধরে বৃষ্টি না হওয়ার জন্য সব নদী নালা শুকিয়ে গেল। খাবার জলের সমস্যা দেখা গেল। হাতিরা জল তেষ্টায় ছটফট করতে লাগল। তারা বুঝতে পারল না কীভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবে।
জলের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল হাতিরা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা সেই ঝিলের খোঁজ পেল যেই ঝিলের ধারে শহরের ইঁদুররা বাস করত। ঝিলের খোঁজ পেয়ে হাতিরা পাগলের মতো সেইদিকে ছুটতে লাগল। ঝিলে যাবার পথে পড়ল ইঁদুরে শহর। হাতিরা যখন সেই শহর দিয়ে যাচ্ছিল তখন হাতিদের পায়ের চাপে বহু ইঁদুর মারা পড়ল। বহু ইঁদুর আহত হল। প্রতিরাতে বহু ইঁদুরের মৃত্যু হতে লাগল। হাতিরা বুঝতেও পারল না তাদের জন্য ইঁদুর নগরীর হাজার।হাজার ইঁদুরদের কত ক্ষতি হচ্ছে। ইঁদুররা তো পড়ল মহাবিপদে। তারা গভীর চিন্তায় পড়ল। তারা একটা জরুরি সভা ডাকল। এক বুড়ো বিজ্ঞ ইঁদুর পরামর্শ দিল, যাও গজরাজের সঙ্গে দেখা কর।গজরাজকে গিয়ে যদি আমাদের বিপদের কথা বলা হয়, তিনি সব শুনে হাতিদের বলতে পারেন যে তারা যেন শহরের মধ্যে দিয়ে না যায়। হাতিরা যদি শহরের মধ্যে দিয়ে না যায় তবেই ইঁদুররা বেঁচে যাবে।
তিনটি ইঁদুরকে বাছা হল গজরাজের কাছে অনুরোধ নিয়ে যাবার জন্য। এই তিনটি ইঁদুর ভয়ে ভয়ে গজরাজের কাছে গেল। তারা গজরাজকে প্রণাম জানিয়ে বলল, মহারাজ, আপনি আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন। আমরা মহাবিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি। প্রতিদিন হাতির দল আমাদের ইঁদুর নগরীর মধ্য দিয়ে ঝিলে জল খেতে যায়।
আপনারা হলেন শক্তিশালী, অসীম ক্ষমতার অধিকারী। আপনাদের পায়ের চাপে প্রতিদিন।বহু ইঁদুরের মৃত্যু ঘটছে। আমরা হলাম ছোটো জীব। আপনাদের শক্তির কাছে আমরা কিছুই নই। দয়া করুন মহারাজ। আপনিই পারেন আমাদের এই বিপদের থেকে বাঁচাতে।
এরপর তারা আরও, বলল, কোনো সময় যদি আমরা আপনাদের কোনো কাজে আসি তবে নিশ্চয় আমরা তা করব।
দয়ালু স্বভাবের গজরাজ এই তিনটি ইঁদুরকে বলল, তোমরা নিশ্চিন্তে ইঁদুর নগরীতে ফিরে যাও। তোমাদের আর কোনো ক্ষতি হবে না।
ইঁদুররা তো এরপর মহাসুখে থাকল। বহুদিন পর দেশের রাজার যুদ্ধের জন্য হাতি দরকার পড়ল। তিনি হাতির খোঁজে লোক পাঠালেন। তারা খুঁজতে খুঁজতে সেই জঙ্গলে এল যেখানে বহু হাতির বাস ছিল। রাজার লোকজন গর্ত খুঁড়ে ডালপালা দিয়ে চাপা দিল। হাতি ধরার ফাঁদ ছিল এই গর্তগুলো। হাতিরা যখন জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করছিল তখন তারা এই গর্তে পড়ে গেল। গর্তে পড়ে হাতিরা ছটফট করতে লাগল, কিন্তু বৃথাই চেষ্টা। রাজার লোকজন এসে তাদের গর্ত থেকে তুলে দড়ি দিয়ে দিয়ে বাঁধল। রাজার লোকজন এতগুলো হাতিকে একসঙ্গে ধরতে পেরে খুব খুশি হল। তারা এই আনন্দ সংবাদ রাজাকে দিতে গেল। গজরাজ তার দলের হাতিদের বন্দি অবস্থায় দেখে ছটফট করতে লাগল ও চোখের জল ফেলতে লাগল। সে বুঝতে পারল না
এই বিপদ থেকে কীভাবে অন্যান্য হাতিকে রক্ষা করা যায়।
অনেক চিন্তার পরে হঠাৎ গজরাজের ইঁদুরদের কথা মনে পড়ল। সব হাতিরা কাঁদে আটকা পড়লেও গজরাজের রানি ফাঁদে আটকা পড়েনি। গজরাজ রানিকে ডেকে বলল, ইঁদুরদের কাছে যাও। তাদের গিয়ে আমাদের বিপদের কথা বলো।
রানি তখনই ইঁদুরদের কাছে গিয়ে হাতিদের বিপদের কথা বলল। ইঁদুররা এই কথা শুনে বলল, কোনো চিন্তা কোরো না। একসময় গজরাজ আমাদের জীবন দান করেছিলেন। আজ হাতিদের বিপদে আমরা প্রাণ দিয়ে তাদের রক্ষা করব।
দলে দলে ইঁদুররা এসে সেই জঙ্গলে হাজির হল। তারা ধীরে ধীরে তাদের ধারালো দাঁত দিয়ে তাদের দড়ি কেটে ফেলল। এইভাবে তারা সমস্ত হাতিকে মুক্ত করল, হাতিরা।তো খুব খুশি।
ইঁদুররা গজরাজের ঋণ শোধ করার সুযোগ পেয়ে খুশি হল। ইঁদুর ও হাতিরা আনন্দে মেতে উঠল। গজরাজ বলল, এই তো আনন্দের উৎসব, মিতালির উৎসব। আজ আমরা হাতি ও ইঁদুররা একসঙ্গে নাচব, গাইব, মজা করব। গজরাজ বলল, আজ থেকে আমরা প্রকৃত বন্ধু।
