সপ্তম শ্রেণী ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় হাতে কলমে সকল প্রশ্নের উত্তর
![]() |
সপ্তম শ্রেণী ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় অনুশীলন প্রশ্নের উত্তর
ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায়ের প্রশ্নের উত্তর দেখুন
ভেবে দেখো...খুঁজে দেখো...
১। নীচের নামগুলির মধ্যে কোনটি বাকিগুলোর সঙ্গে মিলছে না তার তলায় দাগ দাও :
(ক) নাড়ু, চোল, উর, নগরম।
উত্তর : চোল।
(খ) ওদন্তপুরী, বিক্রমশীল, নালন্দা, জগদ্দল, লখনৌতি।
উত্তর ঃ লখনৌতি।
(গ) জয়দেব, ধীমান, বীটপাল, সন্ধ্যাকর নন্দী, চক্রপাণিদত্ত।
উত্তর ঃ জয়দেব।
(ঘ) লুইপাদ, অশ্বঘোষ, সরহপাদ, কাহ্নপাদ।
উত্তর : অশ্বঘোষ ।
২। নিম্নলিখিত বিবৃতি গুলির সঙ্গে তা নিচের কোন ব্যাখ্যাটি তোমার সবচেয়ে মানানসই বলে মনে হয়?-- পূর্ণমান ১
(ক) বিবৃতি ও বাংলার অর্থনীতি পাল-সেন যুগে কৃষিনির্ভর হয়ে পড়েছিল।
উত্তর ব্যাখ্যা-(২ ) : পাল-সেন যুগে ভারতের পশ্চিম দিকের সাগরে আরব বণিকদের দাপট বেড়ে গিয়েছিল।
(২) বিবৃতি : দক্ষিণ ভারতে মন্দির ঘিরে লোকালয় ও বসবাস তৈরি হয়েছিল।
উত্তর : ব্যাখ্যা-১ : রাজা ও অভিজাতরা মন্দিরকে নিষ্কর জমি দান করতেন।
(গ) বিবৃতি : সেন যুগে বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসার কমে গিয়েছিল।
উত্তর : ব্যাখ্যা-২ : সেন রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মকেই প্রাধান্য দিতেন।
৩। সংক্ষেপে (৩০-৫০টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও :- পূর্ণমান-৩
(ক) দক্ষিণ ভারতে খ্রিস্টীয় নবম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে বাণিজ্যের উন্নতি কেন ঘটেছিল।
উত্তর : দক্ষিণ ভারতে খ্রিস্টীয় নবম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে বণিজ্যের উন্নতি লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন লেখ থেকে জানা যায় যে, চেট্টি বা বণিকরা পণ্য সাজিয়ে যাতায়াত করতেন। বিভিন্ন বণিক সংগঠন বা সমবায়ের কথাও জানা যায়। ওই সংগঠনগুলি বিভিন্ন মন্দিরকে জমি দান করতেন, তার বর্ণনাও দক্ষিণ ভারতে তাম্রলেখ গুলিতে পাওয়া যায়। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চোলদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানকার বাণিজ্যের ওপর ভারতীয় বণিকদের প্রভাব আস্তে আস্তে বেড়েছিল।
(খ) পাল ও সেন যুগে বাংলায় কী কী ফসল উৎপন্ন হত? সেই ফসলগুলির কোন্ কোটি এখনও চাষ করা হয়?
উত্তর : পাল ও সেন যুগে প্রধান ফসলগুলির মধ্যে ছিল ধান, সর্ষে ও নানারকমের ফল, যেমন—আম, কাঁঠাল, কলা, ডালিম, ডুমুর, খেজুর, নারকেল ইত্যাদি। এ ছাড়া কার্পাস, তুলো, পান, সুপুরি, এলাচ, মহুয়া ইত্যাদি ফসলগুলি উৎপন্ন হত। ওই ফসল ও ফল প্রায় সবগুলিই এখনও চাষ হয়।
(গ) রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজসভার সাহিত্যচর্চার পরিচয় দাও।
উত্তর : রাজা লক্ষ্মণসেন তাঁর রাজসভায় নানা কবি ও সাহিত্যিকগণকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্থান দিয়েছিলেন। বিদ্বান ও বিদ্যার প্রতি তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিল। পিতা বল্লালসেনের আরদ্ধ দানসাগর গ্রন্থখানি লক্ষ্মণসেন সম্পূর্ণ করে নিজের মানসিক উৎকর্ষের পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রসিদ্ধ বাঙালি বৈষুবকবি জয়দেব ও কবি ধোয়ী, গোবর্ধন, শরণ, উমাপতিধর প্রভৃতি তাঁর রাজসভা অলংকৃত করেছিলেন। এজন্য একে বলা হত পঞ্চরত্ন।
(ঘ) পাল শাসনের তুলনায় সেন শাসন কেন বাংলায় কম দিন স্থায়ী হয়েছিল?
উত্তর ঃ বাংলায় চারশো বছরেরও বেশি সময় পাল শাসনব্যবস্থা স্থায়ী হয়েছিল। কারণ—(১) খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকের মধ্যভাগে বাংলায় প্রভাবশালী লোকেরা গোপাল পাল নামে এক বিচক্ষণ ও পরাক্রমশালী ব্যক্তিকে রাজসিংহাসনে বসায়। পরবর্তীকালে পালরাজারাও জনগণের কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু বিজয়সেন একসময় পালরাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাংলার সিংহাসন দখল করেন। (২) পাল আমলে বাংলার গ্রামকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা বেশ সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু সেন আমলে স্থানীয় গ্রামীণ শাসন অবনতির পথে এগিয়ে চলেছিল।(৩)শিক্ষাদীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও ধর্মচর্চায় পালযুগ যতখানি উন্নত ছিল, সেন যুগে ততখানি ছিল না ।
৪। বিশদে (১০০-১২০টি শব্দের মধ্যে) উত্তর লেখো : পূর্ণমান-৫
(ক) ভারতের সামন্ত ব্যবস্থার ছবি আঁকতে গেলে কেন তা একখানা ত্রিভুজের মতো দেখায়? এই ব্যবস্থায় সামন্তরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করত ?
উত্তর ঃ ভারতের সামন্ত ব্যবস্থার ছবি আঁকতে গেলে তা একখানা ত্রিভুজের মতো দেখায়, কারণ—এই সামন্ত ব্যবস্থায় সবার ওপরে থাকে রাজা। সবার নীচে থাকে সাধারণ জনগণ বা খেটে খাওয়া মানুষজন। আর তাদের ওপর বেশ কিছু সামন্ত বা মাঝারি শাসক এবং তাদের ওপরে থকে অল্প কিছু মহাসামন্ত। ফলে এই ব্যবস্থার ছবি ত্রিভুজের মাথা থেকে নীচ অবধি ক্রমশ চওড়া হয়ে গেছে বলে ত্রিভুজের মতো দেখায়। রাজা থেকে জনগণ অবধি রাজস্ব ও শাসনের এই স্তরে স্তরে ভাগ হয়ে যাওয়াকে সামন্ত ব্যবস্থা বলে।
সামন্ত ব্যবস্থায় সামন্ত ও মহাসামন্তদের মধ্যে সবসময় যুদ্ধ-ঝগড়া লেগেই থাকত। সবাই নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ব্যস্ত ছিল। অনেকসময় তারা একসঙ্গে জোট বেঁধে রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। রাজার ক্ষমতাকে তারা একসময় অস্বীকার করত, মানতে চাইত না। এর ফলে সেইসময় রাজশক্তির দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে যায়। সামন্ত অত্যাচারে গ্রামের স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা নষ্ট হয়েছিল।
(খ) পাল ও সেন যুগের বাংলার বাণিজ্য ও কৃষির মধ্যে তুলনা করো।
উত্তর : পাল ও সেন যুগের বাংলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য। গ্রামবাসীর প্রয়োজনায় পার যাবতীয় জিনিসপত্রই গ্রামে তৈরি হত। সেই যুগে বাংলার অর্থনীতিতে বাণিজ্যের গুরুত্ব ক্রমশই কমে এসেছিল।
আরব বণিকদের অত্যাচারে বাংলার বণিকরা পিছু হটেছিল। সেই যুগে বাণিজ্যের অবনতির সঙ্গে সঙ্গে সোনারুপার ব্যবহার কমে যায়। তার ফলে কড়ি হয়ে গিয়েছিল বেচাকেনার প্রধান মাধ্যম। হস্তশিল্পের মধ্যে কাঠ এবং ধাতুর তৈরি দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস, গয়নার কথা জানা যায়। শিল্পীরা বিভিন্ন নিগম বা গোষ্ঠীতে সঙ্ঘবদ্ধ ছিলেন।
পালযুগে ও সেনযুগে পাল রাজারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ভূমিদান করতেন এবং সেনরাজারা ব্রাহ্মণদের ভূমিদান
করতেন। জমিতে মূল অধিকার ছিল রাষ্ট্রের বা রাজাদের তবে কৃষকদের সেই আমলে অবহেলা করা হত না।
রাজারা উৎপন্ন ফসলের ৬ ভাগের ১ ভাগ কৃষকদের কাছ থেকে কর নিতেন। বণিকরাও রাজাকে কর দিত। প্রজারা আত্মরক্ষার তাগিদে রাজাকে কর দিত।
(গ) পাল আমলের বাংলার শিল্প ও স্থাপত্যের কী পরিচয় পাওয়া যায় তা লেখো।
উত্তর ঃ পালযুগে বাংলার শিল্প ও স্থাপত্যের এক অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছিল। পালরাজাগণের সাহায্যেই নালন্দা, ওদন্তপুরী, বিক্রমশীল ও সোমপুর মহাবিহারগুলি নির্মিত হয়েছিল। পালযুগে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বিহারের প্রসিদ্ধি
লাভ করেছিল। বিক্রমশীল মহাবিহারে মোট ১০৭টি মন্দির ও ৬টি মহাবিদ্যালয় ছিল। মন্দিরের গায়ে পাথরের ফলক থাকত। এই সকল মাঠের নির্মাণ পদ্ধতি সে যুগের স্থাপত্য কৌশলের পরিচায়ক। সোমপুরী মহাবিহারের ভগ্নাবশেষ রাজশাহি জেলায় আবিষ্কৃত হয়েছে। পালযুগে স্তূপ, বিহার মন্দিরের নির্মাণকৌশল ছিল বিভিন্ন ধরনের।
পালযুগের শিল্পীরীতিকে প্রাচ্য শিল্পরীতি বলা হয়। এই যুগে নির্মিত কয়েকটি মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এগুলির গড়ন দেখলে পালযুগের ভাস্কর্য শিল্পের উন্নতির কথা জানা যায়। ধীমান ও তাঁর পুত্র বীটপাল ছিলেন সে যুগের শ্রেষ্ঠ ভাস্কর, চিত্রশিল্পী ও ধাতুমূর্তি শিল্পী। ভাস্কর্যের মধ্যে পোড়ামাটির শিল্পসামগ্রী ছিল। এগুলি ছিল শিল্পের প্রতীক।
এগুলিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, সমাজজীবন, ধর্মবিশ্বাসের ছবি ফুটে উঠেছে।
(ঘ) পাল ও সেন যুগে সমাজ ও ধর্মের পরিচয় দাও।
উত্তর ঃ পাল ও সেন যুগে বাংলায় সমাজের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল বিভিন্ন জাতির উদ্ভব। পালরাজারা ব্রাহ্মণ ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী। সমাজে সাধারণ মানুষরা মোটামুটি সচ্ছল ছিল। ভূমিহীন ব্যক্তি ও শ্রমিকের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। একাদশ শতকের শেষদিকে উত্তরবঙ্গে যে কৈবর্ত বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল তা নিঃসন্দেহে নিম্নশ্রেণির মধ্যে সামাজিক প্রতিবাদের দিকচিহ্ন হিসেবে আজও স্মরণীয়। সেনারাজারা কিন্তু ব্রাক্ষ্মণ্য ধর্মকেই প্রাধান্য দিতেন। ব্রাক্ষ্মণ্যধর্মের মধ্যে বৈদিক ধর্ম ও পৌরাণিক ধর্মের মিশ্রণ ছিল। স্ত্রীলোকেরা নানারকম ব্রত, উপবাস পালন করত। ইন্দ্র, অগ্নি, কুবের, সূর্য, গঙ্গা, যমুনা, শিব, দুর্গা, কালী পুজো করা হত। ব্রাহ্মণরা অন্যান্য সবার কাজ করতে পারতেন। কিন্তু ব্রাক্ষ্মণ ছাড়া তাঁদের কাজ কেউ করতে পারত না।
ব্রাহ্মণরা সমাজপতি হিসেবে সুবিধা ভোগ করতেন। সেনযুগে সমাজে আদিবাসী-উপজাতি মানুষের কথাও জানা যায়।
সেনরাজাদের আমলে গ্রাম্য শাসনব্যবস্থার অবনতি ঘটেছিল। সেইসময় রাষ্ট্র অসংখ্য ছোটো ছোটো খণ্ডে বিভক্ত ছিল। সেইসময় সমাজ চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, যথা—ব্রাক্ষ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।
৫। কল্পনা করে লেখো (১০০-১৫০টি শব্দের মধ্যে) ঃ
পূর্ণমান-৮
(ক) যদি তুমি খ্রিস্টীয় দশম শতকের বাংলার একজন কৃষক হও, তাহলে তোমার সারাদিন কেমনভাবে কাটবে তা লেখো।
উত্তর : খ্রিস্টীয় দশম শতকের কৃষক হয়ে আমার সারাদিন ভালোভাবে কাটল। কারণ দশম শতকের সময় অর্থাৎ, পালরাজাদের সময় কৃষকরা অত্যাচারিত হত না, কৃষকরা সুখে-স্বাচ্ছন্দে থাকত। আমি সারাদিন জমির দেখাশোনা করলাম, জমিতে উৎপন্ন ফসল দেখলাম, ফসলের মধ্যে সর্যে ছিল প্রধান। তাই সর্যের চাষ দেখলাম এবং বিভিন্ন ফলের চাষ দেখলাম। কৃষকরা রাজাদের যে কর দেয় তাও দেখলাম। আমি কৃষক হয়ে আমার নিজস্ব কিছু ফসলের
জন্য কর প্রদান করলাম। প্রজারাও তাদের নিজেদের স্বাচ্ছন্দের জন্য রাজাকে কর দিল। অবসর সময়ে আমি আমার বাড়ির নানা খুঁটিনাটি কাজ করলাম, উৎপন্ন ফসল যত্ন করে রাখার ব্যবস্থা করলাম। আমি বড়ো বড়ো বাঁশবনের মধ্যে ঢুকলাম। সেখানে বিশ্রাম করলাম। কৃষক হয়ে আমার জমি যদি বিক্রিও হত রাজা আমাদের ডেকে জিজ্ঞসা করতেন। আমি রাজি হলেই আমার জমি বিক্রি করা হত। তারপর রাজার সঙ্গে দেখা করে বাড়ি চলে গেলাম।
(৮) মনে করো তুমি বিক্রমশীল মহাবিহারের একজন ছাত্র। তোমার শিক্ষক দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (অতীশ) তিব্বত চলে যাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে তুমি কী কথা বলবে? তিনিই বা তোমাকে কী বলবেন? এই নিয়ে একটি কাল্পনিক কথোপকথন লেখো।
উত্তর : আমি ঃ প্রমাম নেবেন আচার্য।
অতীশ দীপঙ্কর ঃ আশীর্বাদ করি, মানুষ হও।
আমি ঃ আপনি তো দুর্গম তিব্বতে চলে যাচ্ছেন। আমাকে কিছু উপদেশ দিয়ে যান।
অতীশ ঃ হ্যাঁ, আরও জ্ঞান আহরণ করো। বুদ্ধদেবের বাণীসমূহ বারবার পাঠ করো। শেষ উপদেশ দেবো, বুদ্ধের শরণাগত হও।
আমি ঃ কিন্তু, আমরা আপনার মতো একজন মহাজ্ঞানী পণ্ডিতকে যে এই মুহূর্তে হারাচ্ছি, এই অভাব পূরণ করব কীভাবে?
অতীশ ঃ না, এ ধারণা ঠিক নয়। এই মহাবিহারে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) আরও অনেক জ্ঞানী-গুণী পণ্ডিত আছেন। তাঁরা তোমাদের নিশ্চয়ই ঠিক ভাবে, যত্ন নিয়ে শিক্ষা দেবেন।
আমি ঃ হ্যাঁ, তা অবশ্য দেবেন। এটাই মহাবিহারের মহান আদর্শ।
অতীশ : তাহলে আর অসুবিধা কোথায়? তাঁদের উপদেশ মান্য করে চলবে। শরীরের প্রতি যত্ন নেবে। পিতা-মাতার প্রতি খেয়াল রাখবে। মনে রাখবে, নির্বাণ লাভই জীবনের শেষ কথা।
আমি ঃ হ্যাঁ, আচার্যদেব। আপনার উপদেশমতো চলব। প্রার্থনা করি, আপনি তাড়াতাড়ি ফিরে আসুন। আপনি ফিরে এলে আপনার কাছ থেকে আপনার তিব্বত যাত্রার সব ঘটনা, অভিজ্ঞতা শুনব। আরও অনেক কিছু শিখতে পারব, জানতে পারব আপনার কাছ থেকে। প্রণাম আচার্যদেব।
অতীশ ঃ হ্যাঁ, এসো। জ্ঞানবান হও। দীর্ঘায়ু হও।
★ অনুশীলন বাইরে এই অধ্যায়ের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর সহ [প্রতিটি প্রশ্নমান-১]
(ক) বৌদ্ধ দার্শনিকদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল বিহার। (বিহার/চিন/কোরিয়া)।
উত্তর: বিহার
(খ) বিহার রাজ্যে নালন্দা বৌদ্ধবিহার তৈরি হয়েছিল। (তিব্বত/তক্ষশিলা/নালন্দা)।
উত্তর: নালন্দা
(গ) পাল আমলের ভাস্কর্যগুলো ছিল ওই আমলের শিল্পের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। (ভাস্কর্যগুলো/স্থাপত্য/মূর্তি)।
উত্তর: ভাস্কর্যগুলো
(ঘ) পালযুগের ফলকগুলিতে মূর্তি আছে রাধাকৃষ্ণ। (রাধাকৃষ্ণ/বুদধ/দুর্গা)।
উত্তর: রাধাকৃষ্ণ
(ঙ) সেন রাজারা ব্রাক্ষ্মণ্য ধর্মকেই প্রাধান্য দিতেন। (ব্রাহ্মণ্য/কায়স্থ / বৌদ্ধ)।
উত্তর: ব্রাহ্মণ্য
(চ) পালযুগে প্রসিদ্ধ শিল্পী ছিলেন ধীমান। (ধীমান/সন্ধ্যাকর নন্দী/রাজা)।
উত্তর: ধীমান
(ছ) লক্ষ্মণসেনের মন্ত্রী ছিলেন হলায়ুধ। (হলায়ুধ / ধীমান / বীটপাল)।
উত্তর: হলায়ুধ
(জ) সাহিত্য হল সমাজের আয়না। (প্রতীক/আয়না/অংশ)।
উত্তর: আয়না
(ঝ) সর্ববৃহৎ বৌদ্ধকেন্দ্র ছিল বোরোবুদুরে। (বোরোবুদুরে/আঙ্কোরভাট/ইন্দোনেশিয়া)।
উত্তর: বোরোবুদুরে
(ঞ) সেনরাজাদের মধ্যে লক্ষ্মণসেন ছিলেন বৈঘ্নব। (বৈয়ব/শৈব/ব্রাক্ষ্মণ)।
উত্তর: বৈঘ্নব
(ট) রাজপরিবারে মহিলাদের গুরুত্ব বেড়েছিল (মহিলাদের/পুরুষদের অন্যদের)।
উত্তর- মহিলাদের
এককথায় উত্তর দাও : [প্রতিটি প্রশ্নমান-১]
(ক) পালযুগের শিল্পরীতিকে কী বলে?
উত্তর : প্রাচ্য শিল্পরীতি
(খ) 'রামচরিত' কার রচনা?
উত্তর : সন্ধ্যাকর নন্দী।
(গ) পাল, সেন যুগে গৃহপালিত ও বন্য প্রাণীর নামগুলি লেখো।
উত্তর ঃ গোরু, বলদ, হাঁস, মুরগি, পায়রা, কাক, কোকিল, নানান জলচর পাখি, ঘোড়া, উট, হাতি, বাঘ, বুনো মোষ।
(ঘ) শিল্পদ্রব্যের মধ্যে প্রধান সামগ্রী কী ছিল?
উত্তর : কার্পাস বস্ত্ৰ।
(ঙ) পাল ও সেন যুগে কী কী ফসল ছিল?
উত্তর : ধান, সর্ষে ইত্যাদি।
(চ) রাজারা কৃষক যে কাছ থেকে কতটা কর নিতেন?
উত্তর: উৎপন্ন ফসলের এক ষষ্ঠাংশ।
(ছ) পাল ও সেন যুগে জিনিস কেনাবেচার মাধ্যম কি ছিল?
উত্তর: কড়ি।
(জ) পাল ও সেন যুগের বাংলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি কি ছিল?
উত্তর: কৃষি মূল ভিত্তি কী ছিল ?
(ঝ) পাল রাজারা কোন্ ধর্মের প্রতি অনুরাগী ছিলেন?
উত্তর : বৌদ্ধধর্ম।
(ঞ) নালন্দা বৌদ্ধবিহার কবে তৈরি হয়েছিল?
উত্তর ঃ গুপ্ত সম্রাটের আমলে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে বিহার রাজ্যের
(ট) চোল রাজ্যের কোন্ শিল্প খুব বিখ্যাত ছিল?
উত্তর : ব্রোঞ্জ হস্তশিল্প।
(ঠ) শিল্পদ্রব্যের মধ্যে প্রধান সামগ্রী কোনটি ছিল?
উত্তর : কার্পাস বস্ত্ৰ।
(ড) নালন্দা বৌদ্ধবিহার (বিশ্ববিদ্যালয়) কোথায় ছিল?
উত্তর ঃ আজকের বিহার রাজ্যে, রাজগিরের কাছে।
(ঢ) নালন্দায় কোন্ দেশের ছাত্রদের শিক্ষাদানের জন্য বিশেষ তহবিলের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল?
উত্তর : চিনদেশের।
(ণ) পাল আমলের উল্লেখযোগ্য বিহার কোনটি ?
উত্তর : পাহাড়পুরের প্রত্নক্ষেত্রে।
সংক্ষেপে (৩০-৫০টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও : [প্রতিটি প্রশ্নমান-৩]
(ক) পাল আমলের ভাস্কর্যগুলির উৎকৃষ্ট নিদর্শনের কী পরিচয় পাওয়া যায়?
উত্তর ঃ পাল আমলের ভাস্কর্যগুলি ওই আমলের শিল্পের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট নিদর্শন। পাহাড়পুর প্রত্নক্ষেত্রে এর
সবচেয়ে ভালো নিদর্শন পাওয়া যায়। এখানে মূল মন্দিরের গায়ে পাথরের ফলক রয়েছে যার মধ্যে স্থানীয় রীতির প্রভাব স্পষ্ট। ফলকগুলিতে রাধাকৃষ্ণ, যমুনা, বলরাম, শিব, বুদ্ধর মূর্তি আছে। এই দেবদেবীর মধ্যে ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যের প্রভাব অনেক বেশি।
(খ) পালযুগের শিল্পীরিতর পরিচয় দাও ।
উত্তর ঃ পালযুগের শিল্পরীতিকে প্রাচ্য শিল্পরীতি বলা হয়। এই রীতির পূর্বসূরী ছিল গুপ্তযুগের শিল্পকলা, পাল আমলের স্থাপত্যের মধ্যে ছিল স্তূপ, বিহার ও মন্দির। তবে প্রকৃতির কোপে ও মানুষের রোষে সেই স্থাপত্যের কিছুই এখন নেই।
(গ) রাজপুত্র কাদের বলা হত?
উত্তর ঃ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাজপুতের নাম অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকের মতে, খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে হুনদের আক্রমণের পরে বেশকিছু মধ্য এশীয় উপজাতির মানুষ উত্তর-পশ্চিম ভারতে বসবাস করতে থাকে। স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের বিবাহও হয়। এদের বংশধরদের রাজপুত বলে। তবে রাজপুতরা নিজেদেরকে স্থানীয় ক্ষত্রিয় বলে মনে করে। তারা নিজেদের চন্দ্র, সূর্য বা অগ্নি দেবতার বংশধর বলে মনে করত।
(ঘ) চর্যাপদ ককে বলে?
উত্তর : খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকে লেখা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের কবিতা ও গানের সংকলনকে বলে চর্যাপদ।
চর্যাপদে যে ভাষা রয়েছে তা হল আদি বাংলা ভাষার নিদর্শন। আচার্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল থেকে এই চর্যাপদের পুঁথি উদ্ধার করেন।
বিশদে (১০০-১২০টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও :
(ক) নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরণ দাও।
[প্রতিটি প্রশ্নমান-৫]
উত্তর : নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় : বর্তমানে বিহার রাজ্যের রাজধানী পাটনা জেলার অন্তর্গত বড়গাঁও গ্রামে (রাজগিরের কাছে) নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল। এশিয়ার বৃহত্তম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষায়তন হিসেবে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি
ছিল দেশবিদেশে। চিন, কোরিয়া প্রভৃতি এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বহু ছাত্র শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে এখানে আসত। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দশ হাজার ছাত্র লেখাপড়া করত। শোনা যায় যে, এই মঠটি ছিল ছয়তলা এবং এর মধ্যে তিনটি পাঠাগার ছিল। ছাত্রদের অধ্যাপনার জন্য ১০০টি কক্ষ ছিল। শীলভদ্র নামে এক বাঙালি পণ্ডিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের
অভাকক্ষ ছিলেন। পড়াশোনার জন্য এখানে ছাত্রদের কোনো ব্যয়ভার গ্রহণ করতে হত না। অধ্যয়নরত ছাত্রদের জামাকাপড়, বিছানাপত্র, ওষুধ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব হত না, কারণ চাইবার আগেই তারা তা পেয়ে যেত। হিউয়েন সাঙ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দু-বছর পঠনপাঠন করেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যাচর্চা
ও গ্রন্থাগারগুলিতে পুঁথির সংগ্রহ দেখে বিস্মিত হন। তাঁকে অনুসরণ করে চিন ও কোরিয়া থেকে প্রায় এগারো জন পণ্ডিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করতে এসেছিলেন। ত্রয়োদশ শতকে তুর্কি অভিযানকারীরা বিহার অঞ্চল
আক্রমণ করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপক ক্ষতি করেছিল।
(খ) ভারতীয় সভ্যতা প্রসারে অতীশ দীপঙ্করের ভূমিকা কেমন ছিল?
উত্তর : ভারতীয় সভ্যতা প্রসারে অতীশ দীপঙ্করের ভূমিকা ঃ একাদশ শতাব্দীতে তিব্বতের রাজার আমন্ত্রণ
পেয়ে ভারতীয় বৌদ্ধ পণ্ডিত শ্রীঅতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে যান। বৌদ্ধধর্ম প্রচার করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। তিনিই
ছিলেন সে যুগের ভারতের বিক্রমশীল মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতে ‘অতীশ দীপঙ্কর' নামে পরিচিত হন। তিনি তিব্বতের নানা স্থানে হীনযান বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। তাঁর চেষ্টাতেই ধর্মের পাশাপাশি ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতিও তিব্বতে প্রভাব বিস্তার করেছিল।
তিনি প্রায় দুশোটি বৌদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর চেষ্টায় অনেকগুলি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ তিব্বতী ভাষায় রচিত হয়।
দীপঙ্করের লিখিত গ্রন্থগুলির মধ্যে ‘ত্যার' ও 'ক্যাঙ্গুর' গ্রন্থ দুটি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। জীবনের শেষ দিনেও
তিনি ধর্মগ্রন্থ রচনা করে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। তিব্বতে তেরো বছর কাটানোর পর তিনি সেখানে দেহত্যাগ করেছিলেন। তাঁকে সমাধি দেওয়া হয় তিব্বতের রাজধানী লাসার অনতিদূরে। সেখানে তিব্বতবাসী তাঁকে এখনও বুদ্ধের অবতাররূপে পূজা করে।
রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দাও :
[প্রতিটি প্রশ্নমান-৮]
(ক) হিউয়েন সাঙের বিবরণী থেকে ভারতের সামাজিক, আর্থিক, রাজনৈতিক অবস্থার পরিচয় দাও।
উত্তর : হিউয়েন সাঙের বিবরণী থেকে ভারতের সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক অবস্থার যে পরিচয় পাওয়া যায় তা হল :
সামাজিক জীবন : হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে পুরোহিত সম্প্রদায় ও অভিজাতরা আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন করত।
পক্ষান্তরে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের জীবন ছিল সাধারণ মানের। অস্পৃশ্যরূপে 'শূদ্র'রা গণ্য হত। 'শূদ্র'রা সে যুগে এমনই অস্পৃশ্য ছিল যে শহরে প্রবেশের আগে কোনো শব্দ বা চিৎকার করে জানিয়ে দেওয়া হত যাতে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি তাদের স্পর্শ না করে। তখন নারী স্বাধীনতা ছিল না। বিধবাবিবাহ ছিল না। সতীদাহপ্রথা ছিল। কারণ তাদের স্পর্শ করলে সমাজে সেই ব্যক্তির জাতিভ্রষ্ট হওয়ার ভয় ছিল।
আর্থিক জীবন ঃ ভারতের অর্থনীতি মোটামুটি সচ্ছল ছিল। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ ছিল কৃষিজীবী।
জনসাধারণের ওপর কর ভার বেশি ছিল না। জনসাধারণকে খুব সামান্যই কর দিতে হত। দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রাজার চেষ্টার কোনো ত্রুটি দেখা যেত ন।
রাজনৈতিক জীবন ঃ ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো বেশ ভালোই ছিল। রাজা দেশের প্রকৃত অবস্থার স্বরূপ জানার জন্য নিজের রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতেন। রাজার সভায় জৈন, বৌদ্ধ, ব্রাক্ষ্মণ পণ্ডিতেরা যাতায়াত করতেন।
(খ) নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া সম্বন্ধে দশটি বাক্য লেখো।
উত্তর : নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া সম্বন্ধে দশটি বাক্য : (১) নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ভারতবর্ষের প্রসিদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। (২) এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষায়তন ছিল।(৩) গুপ্তযুগের সম্রাটেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। (৪) এই বিশ্ববিদ্যালয়ে দশ হাজার ছাত্র পড়াশোনা করত। (৫) এখানে একজন সন্ন্যাসী শিক্ষক ছিলেন। (৬) এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বৌদ্ধ দর্শন, হিন্দু ধর্মশাস্ত্র, সাংখ্য, ব্যাকরণ, সাহিত্য, গণিত ইত্যাদি বিষয় পড়ানো হত। (৭) এখানে শিক্ষা ছিল অবৈতনিক। (৮) বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের জন্য ছাত্রদের যোগ্যতার কঠোর পরিচয় দিতে হত। (৯) হিউয়েন সাঙ নিজে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছর অধ্যয়ন করেছিলেন। (১০) ছাত্রদের কঠোর নিয়ম পালন করতে হত।
(জ) দাক্ষিণাত্যের চালুক্যদের রাজনৈতিক, শিল্প ও স্থাপত্য বিষয়ে আলোচনা করো।
উত্তর : দাক্ষিণাত্যের চালুক্যদের রাজনৈতিক ইতিহাস : দক্ষিণ ভারতের একটি শক্তিশালী বংশ হল বাদামির চালুক্য বলে।
ষষ্ঠ শতাব্দীর গোড়ার দিকে চালুক্য রাজাগণ দাক্ষিণাত্যের কর্ণাট রাজ্য স্থাপন করেন।
• আনুমানিক ৫৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পুলকেশী চালুক্য রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর পুত্র কীর্তিবর্মনের আমলে চালুক্য রাজ্যের
বিস্তৃতি যথেষ্ট ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতা মঙ্গলেশ রাজা হন। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত যোদ্ধা কিন্তু তাঁকে হত্যা করে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র দ্বিতীয় পুলকেশী সিংহাসন লাভ করেছিলেন। এই বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন কীর্তিবর্মনের পুত্র
দ্বিতীয় পুলকেশী। হর্ষবর্ধনকে পরাজিত করে তিনি পরমেশ্বর উপাধি গ্রহণ করেন। হিউয়েন সাঙের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিনি একজন সুশাসক ও প্রজারঞ্জক শাসক ছিলেন। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যে কেবল তাঁর যোগাযোগ ছিল তা নয়, ভারতের বাইরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল। দ্বিতীয় পুলকেশীর মৃত্যুর পর চালুক্যদের ক্ষমতা
অনেকাংশে খর্ব হয়ে যায়। তাঁর উত্তরাধিকারীরা ৭৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।
চালুক্যদের শিল্প ও স্থাপত্য : চালুক্য রাজারা জাতিতে হিন্দু ছিলেন। তাই তাঁদের আমলে সাহিত্য ও শিল্পকলা বেশ উন্নতি লাভ করেছিল। চালুক্য রাজারা প্যাডকল, বাদামি প্রভৃতি স্থানে বহু মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলন। বিখ্যাত অজন্তা গুহার দেয়ালে তাঁরা কয়েকটি উৎকৃষ্ট মানের চিত্র অঙ্কন করিয়েছিলেন।
(ঘ) মধ্যযুগে ভারতের সমাজব্যবস্থার পরিচয় দাও।
উত্তর ঃ ভারতে সামন্তব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল মধ্যযুগে। ভারত ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল সামশুপ্রথা। তবে ইউরোপের সামন্ততন্ত্র ও ভারতের সামন্ততন্ত্রের মধ্যে সময় ও চরিত্র বা বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য ছিল অনেক। ড. রামশরণ শর্মার মতে, ভারতে সামন্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটে গুপ্ত যুগে। ভারতে সামন্ততন্ত্রের সূচনাকাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয় আনুমানিক
৩০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দ। পরবর্তী তিনশো বছর অর্থাৎ ৬০০ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দকে বলা হয় সামন্তন্ত্রের বিকাশকাল।
আর সামন্ততন্ত্রের চরম বিকাশ ঘটেছিল ৯০০ খ্রিস্টাব্দে এবং ধ্বংস হয় প্রায় ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। অবশ্য ড. নুরুল হাসান বলেন, মোগল যুগেও ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল। প্রাপ্ত বিভিন্ন লেখ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে মন্দির ও বৌদ্ধমঠগুলিকে রাজারা ভূমিদান করতেন। সেখান থেকে ভারতে সামন্ততন্ত্রের সূচনা পর্ব ধরা যায়। প্রথমে ব্রাহ্মণদের ভূমিদান করা হত, পরে যোদ্ধা ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদেরও ভূমিদান শুরু হয়। এই সময় ভূমির অধিকারীরা কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন, একে সামন্ততান্ত্রিক খাজনা বলা হত। ভারতে মৌর্যোত্তর যুগে ও
গুপ্তযুগের সূচনায় 'অগ্রহার' ব্যবস্থা প্রসার লাভ করে। এই ব্যবস্থায় ধর্মস্থান ও পুরোহিত সম্প্রদায়কে নিষ্কর ভূমিদান করা হত। প্রচুর ভূমির মালিক হওয়ায় ব্রাক্ষ্মণ ও ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলির হাতে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে তাঁরা ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। সপ্তম শতকে যখন শাসকদের পক্ষে রাজস্ব আদায় করা কষ্টকর হয়ে ওঠে তখন তাঁরা ভূস্বামীদের হাতে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব তুলে দেন। এর ফলে সামন্ততন্ত্রের ভিত্তি হয় আরও দৃঢ়। অন্যদিকে রাজার ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়ে। একাদশ শতকে বাংলার রামপাল কৈবর্তদের দমনের জন্য যেভাবে সামন্তশ্রেণির ওপর নির্ভর করেন তাতে সামস্তদের প্রতিপত্তি ভয়ংকর বেড়ে ওঠে। অনেকে মনে করেন, এই সময় বাণিজ্যের সংকোচন, নগরের গুরত্ব হ্রাস, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ সামন্ততন্ত্রের আবির্ভাবের কারণ ছিল। (১) ভারতের কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব করতে
পারত। (২) এখানে ভূমিদাসত্ব প্রথা ছিল না। (৩) সামন্ততন্ত্রের অন্যতম শর্ত 'চুক্তি' ব্যবস্থা ভারতে ছিল না। (৪) বহু ক্ষেত্রে অগ্রহার দানের ফলে অনাবাদি জমি আবাদি উর্বর জমিতে পরিণত হয়, যা কৃষি অর্থনীতিকে মজবুত করেছিল। যদিও অগ্রহার জমি প্রদানের ফলে নিষ্কর জমির পরিমাণ কমে আসে এবং রাজকোষে ঘাটতি দেখা যায়। বাণভট্ট লিখিত 'হর্ষচরিতে’ সামন্তদের দায়িত্বের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। অবশ্য রোমিলা থাপারের মতে—‘কৃষকদের জীবনে কোনো আশার আলো ছিল না। তাই তারা বাঁচার জন্য অনেকসময় দস্যুবৃত্তি গ্রহণ করত ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করত। মধ্যযুগে ভারতের সামম্ভব্যবস্থায় রাজা তাঁর রাজ্যের ভূমি নির্দিষ্ট রাজস্ব বিনিময়ের শর্তে কয়েকজন অধস্তন ব্যক্তিকে ভাগ করে দিতেন। অধস্তন ব্যক্তি ছিলেন
ছোটো সামন্ত। ছোটো সামন্ত তার এলাকার জমি কয়েকজন অধস্তন ব্যক্তিকে ভাগ করে দিতেন। কৃষক ও রাজার মাঝে কয়েকটি স্তরে জমি বিতরণ করে রাজস্ব আদায় ও শাসন পরিচালনার ব্যবস্থাকে বলে ‘সামন্ত ব্যবস্থা। তাই ভারতের সামস্ত
ব্যবস্থার পরিচয় দিতে গেলে একখানা ত্রিভুজের মতো ছবি দেখাতে হয়। কারণ—(i) এর সর্বোচ্চ আসনে থাকেন একজন রাজা। (ii) তার পরবর্তী স্তরে থাকেন তাঁদের অধস্তন সামস্তরা। (ii) তাঁর নীচের স্তরে থাকেন তাঁদের অধস্তন সামন্তরা এবং
(iv) একেবারে শেষের স্তরে থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ খেটে খাওয়া কৃষকরা।
ভারতবর্ষে সামন্তদের জীবিকা ঃ সামন্তব্যবস্থায় সামস্তরা কেউ শারীরিক পরিশ্রম করে জমিতে ফসল উৎপাদন করত না।
অন্যের শ্রমে তারা উৎপন্ন দ্রব্য বা রাজস্ব থেকে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করত। খেটে খাওয়া কৃষকদের কাছ থেকে ছোটো সামন্ত যত রাজস্ব আদায় করত সে তার কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে বাকি অংশ ওপরের সামস্তকে দিত। ওপরের মাঝারি সামস্তরাও তাদের নিজের নিজের অংশ রেখে বাকি অংশ রাজাকে দিত। এই কৃষক ও রাজার মাঝে এই সামন্তদের মধ্যস্বত্বভোগী বলা হত।
