সপ্তম শ্রেণী ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায়ের অনুশীলন প্রশ্নের উত্তর। দিল্লি সুলতানি তুর্কো আফগান শাসন
সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস
চতুর্থ অধ্যায়
দিল্লি সুলতানি তুর্কো আফগান শাসন অনুশীলন প্রশ্নের উত্তর
ভেবে দেখো...খুঁজে দেখো...
পূর্ণমান-১
১। নীচের নামগুলির মধ্যে কোনটি বাকিগুলির সঙ্গে মিলছে না তার তলায় দাগ দাও ঃ
(ক) ইলতুৎমিশ, রাজিয়া, ইবন বতুতা, বলবন। উত্তর : রাজিয়া।
(খ) তাবরহিন্দ, সুনাম, সামানা, ঝিলাম। উত্তর : সামানা।
(গ) খরাজ, খামস, জিজিয়া, আমির, জাকাত। উত্তর ঃ আমির।
(ঘ) আহমেদনগর, বিজাপুর, গোলকোণ্ডা, পাঞ্জাব, বিদর। উত্তর ঃ পাঞ্জাব।
(ঙ) বারবোসা, মাহমুদ গাওয়ান, পেজ, নুনিজ। উত্তরঃ মাহমুদ গাওয়ান।
২। 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো :পূর্ণমান-১
উত্তর :
'ক' স্তম্ভ 'খ' স্তম্ভ
খলিফা > দুরবাশ
বলবন > তুর্কান-ই চিহ্নলগানি
খলজি বিপ্লব > ইলবারি তুর্কি অভিজাতদের ক্ষমতার অবসান
রুমি কৌশল > বাবর
রাজা গণেশ > বাংলা
৩। সংক্ষেপে (৩০-৫০টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও : [পূর্ণমান-৩]
(ক) দিল্লির সুলতানদের কখন খলিফাদের অনুমোদন দরকার হত?
উত্তর ঃ ইলতুৎমিস খলিফাদের থেকে অনুমোদন পান ১২২৯ খ্রিস্টাব্দে। মোহম্মদ বিন তুঘলক তাঁর আমলে প্রথম মুদ্রায় খলিফার নাম খোদাই করা বন্ধ করে দেন। কিন্তু একসময় ইলতুৎমিসকে যখন কেউই দিল্লির সুলতান বলে মেনে নেয় না তখন ইলতুৎমিস নিজের অধিকার বজায় রাখার জন্য খলিফার অনুমোদন প্রার্থনা করেন। খলিফার
কাছে নানা উপহার পাঠান।
(খ) সুলতান ইলতুৎমিশের সামনে প্রধান তিনটি সমস্যা কী ছিল ?
উত্তর : সমস্যা ১ ঃ কীভাবে সাম্রাজ্যের মধ্যে বিদ্রোহী শক্তিকে সহজেই দমন করা যাবে।
সমস্যা ২ : কীভাবে মধ্য এশিয়ার এক দুর্ধর্ষ মোঙ্গল শক্তিকে মোকাবিলা করা যাবে।
সমস্যা ৩ ঃ কীভাবে সুলতানিতে একটি রাজবংশ তৈরি করা যাবে, যাতে ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী সহজেই কোনো গোলমাল ছাড়া সিংহাসনে বসতে পারে।
(গ) কারা ছিল সুলতান রাজিয়ার সমর্থক? কারা ছিল তাঁর বিরোধী?
উত্তর : রাজিয়ার সমর্থকরা ছিলেন সেনাবাহিনী, দিল্লির সাধারণ লোক এবং অভিজাতদের একাংশ।
তুর্কি অভিজাতরা মনে করতেন রাজিয়া অ-তুর্কি অভিজাতদের বেশি গুরুত্ব দিতেন, তাই তুর্কি অভিজাতরা গোড়া থেকেই তাঁর বিরোধী ছিলেন। এ ছাড়া রাজপুত শক্তিও তাঁর শাসনের বিরোধী ছিল।
(ঘ) আলাউদ্দিন খলজি কীভাবে মোঙ্গল আক্রমণের মোকাবিলা করেন ?
উত্তর ঃ আলাউদ্দিন খলজির সময়ে দিল্লি দু-বার আক্রান্ত হয়ে। তখন সুলতান আক্রমণ ঠেকানোর জন্য বিরাট সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেন। সৈনিকদের থাকার জন্য সিরি নামে নতুন একটি শহর তৈরি করেন। সেই সময় মোঙ্গল জাতিরা সাংঘাতিক দুর্ধর্ষ ছিলেন। তাই দুর্গ নির্মাণ, সৈন্য সংগ্রহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে সফল ভাবে মোঙ্গল আক্রমণের মোকাবিলা করেন।
(ঙ) ইলিয়াসশাহি এবং হোসেনশাহি আমলে বাংলার সংস্কৃতির পরিচয় দাও।
উত্তর : ইলিয়াসশাহি এবং হোসেনশাহি আমলে সংস্কৃতির বিস্ময়কর উন্নয়ন হয়েছিল। এদের সময়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, স্থাপত্য প্রভৃতি বিষয়ের উন্নতি ঘটেছিল। এই সময়ে সুলতানদের অন্য ধর্মমতে বিশ্বাসী মনোভাব বা তাঁদের ধর্মীয় উদারতা বাংলার সব ধর্মের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কে বা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
৪। বিশদে (১০০-১২০টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও : পূর্ণমান-৫
(ক) ৪.২ মানচিত্র (পৃষ্ঠা ৪৮) থেকে আলাউদ্দিন খলজির দাক্ষিণাত্য অভিযানের বিবরণ দাও।
উত্তর : ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে বারবার অভিযানকারীরা ভারতে এসেছে। মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিজ খান ঝড়ের গতিতে যে অভিযান চালান তার সামনে বাকি রাষ্ট্রগুলি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আলাউদ্দিন খলজির সময়ে তাদের দ্বারা দিল্লি দু-বার আক্রান্ত হয়। আলাউদ্দিন পাঞ্জাব, দিল্লি অভিযান করেন। তারপর তিনি চিতোর, রণথম্ভোর
ও কারা অভিযান করেন। তাতেও তিনি ক্ষান্ত হননি। এরপর তিনি গুজরাট জয় করে ১৩০৫ খ্রিস্টাব্দে মাণ্ডু জয় করেন, আরব সাগরের মধ্যে যাদব, বরঙ্গল জয় করেন। তিনি মাদুরাই, লাক্ষাদ্বীপও জয় করেন। তাঁর অভিযান এত দূর প্রসারিত হয়েছিল যে তিনি দক্ষিণ ভারতের তাঞ্জোর, পাণ্ড্য পর্যন্ত জয় করেন। তিনি কাকতীয়, হোয়সল প্রভৃতি অঞ্চলকেও বাদ দেননি। তিনি ছিলেন দুর্ধর্ষ। তাই তাঁর অভিযানও ছিল দুর্ধর্ষ। তাঁর অভিযানেও কোনো দেশ
বাদ ছিল না। এভাবে তিনি দাক্ষিণাত্য অভিযানে সফল হয়েছিলেন।
(খ) দিল্লির সুলতানদের সঙ্গে তাঁদের অভিজাতদের কেমন সম্বন্ধ ছিল তা লেখো।
উত্তর ঃ যে সুলতান যত ভালোভাবে সবদিক সামলাতে পারতেন, তাঁর শাসন তত বেশিদিন টিকত। তবে গিয়াসউদ্দিন বলবনের সময় থেকে সুলতানের ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে মর্যাদাও বাড়তে থাকে। সুলতানরা এতটাই ক্ষমতার অধিকারী
ছিল যে তাঁদের ওপর কেউ কথা বলতে পারত না। সুলতানকে নিয়ে যদি কেউ বিরোধ প্রকাশ করত তাহলে তাদের শাস্তি পেতে হত। আলাউদ্দিন খলজির সময়ে অভিজাতদের কড়া হাতে দমন করা হত। কিন্তু যদি কোনোভাবে
সুলতানদের শাসন আলগা হয়ে যেত তাহলে অভিজাতদের ক্ষমতা বেড়ে যেত। সুলতানরা যেমন অভিজাতদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন তেমনই সময় বা সুযোগ পেলে অভিজাতরাও সুলতানদের মান্য করত না। এ ছাড়াও অভিজাত ছাড়াও উলেমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলতেন সুলতানরা।
সুলতানদের পরামর্শ দিত উলেমা। হিন্দু-মুসলমান সবাই ছিল সুলতানদের প্রজা।
(গ) ইকতা কী? কেন সুলতানরা ইকতা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন?
উত্তর ঃ দিল্লির সুলতানরা সাম্রাজ্যের আয়তন ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছেন। নতুন অধিকার করা অঞ্চল থেকে রাজস্ব আদায় করার দরকার ছিল এবং সেখানকার শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব তাদের ছিল। সুলতানরা যেসব রাজ্যগুলি জয় করলেন বা অধিকার করলেন সেইসব রাজ্যগুলিকে একটি প্রদেশের মতো ধরে নেওয়া হল। এসব প্রদেশকেই বলা হত ইকতা।
এই ইকতার দায়িত্ব নিয়ে থাকতেন একজন সামরিক নেতা। তাকে বলা হত ইকতাদার। ইকতাগুলিকে ছোটো ও বড়ো এই দুইভাগে ভাগ করে নেওয়া হত। বড়ো ইকতাগুলির দায়িত্ব পালনের জন্যও যাঁরা থাকতেন তাঁদের শুধু সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হতো না, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও তাদের পালন করতে হত। ছোট ইকদারগণ শুধুমাত্র সামরিক দায়িত্ব পালন করতেন। সেনাবাহিনী দেখাশোনা করা, বাড়তি রাজস্ব সুলতানদের দেওয়া, দেশে দেশে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা এসব দায়িত্বের উপর থাকতো। এসব ইকতাদার সম্পূর্ণভাবে সুলতানদের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।
(খ) আলাউদ্দিন খলজির সময় দিল্লির বাজারদর নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে তোমার মতামত লেখো।
উত্তর : আলাউদ্দিনের সময় দিল্লির বাজারদর নিয়ন্ত্রণ সুলতানের হাতে যথেষ্ট ছিল। আলাউদ্দিন পুরোপুরি একটি বিরটি সৈন্যদল গঠন করেন এবং সমস্ত সৈন্যদের বেতন নির্দিষ্ট করে দেন। তিনি বাজারের সমস্ত জিনিসের দর নির্দিষ্ট করে দেন। তিনি বাজারদর দেখাশোনা করার জন্য 'শাহানা-ই-মান্ডি' ও দেওয়ান-ই-রিয়াস' নামে দুই রাজকর্মচারী
নিয়োগ করেন। আমার মতে, এটি একটি ভালো বিষয়। এ ছাড়া সুলতানের ঠিক করা দামের চেয়ে কোনো বিক্রেতা দাম বেশি নিলে এবং ক্রেতাকে ঠকালে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। আমার মতে, এটিও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আলাউদ্দিন সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে রেশন ব্যবস্থা চালু করেন। প্রজারা যাতে সঠিক সময়ে খাদ্যশস্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস পেতে পারে তাই সুলতানরা সবসময় তা তাদের কাছে মজুত রাখতেন। তাদের সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় জিনিস জোগান দিতে সুলতান খুবই দায়িত্বশীল ছিলেন। আমি মনে করি, সুলতান ঠিকভাবেই বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করতেন।
(ঙ) বিজয়নগর ও দাক্ষিণাত্যের সুলতানি রাজ্যগুলির মধ্যে সংঘর্ষকে তুমি কি একটি ধর্মীয় লড়াই বলবে?।তোমার যুক্তি দাও।
উত্তর ঃ বিজয়নগর ও দাক্ষিণাত্যের সুলতানি রাজ্যগুলির মধ্যে সংঘর্ষ একটি ধর্মীয় লড়াই বলে আমি মনে করি না।
কারণ ধর্ম নিয়ে লড়াই সুলতানি রাজাদের সঙ্গে বিজয়নগর রাজাদের হয়নি। দাক্ষিণাত্য অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আলাউদ্দিন খলজির সেনাপতি মালিক কাফুর। লোদি সুলতানদের শাসনকালে সুলতানদের ক্ষমতা কিছু বেড়েছিল।
আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ছিলেন মধ্যযুগের বাংলার আন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। বিজয়নগরের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন তুলুভ বংশের কৃষ্ণদেব রায়। তাঁর রাজত্বকালে বিজয়নগরের গৌরব চূড়ান্ত শিখরে উঠেছিল। কৃয়দেব রায়ের মৃত্যুর পর তুলুভ বংশের রাজত্বকালেই বিজয়নগরের সঙ্গে সুলতানদের বিরোধ বাধে। এই যুদ্ধে বিজয়নগর পরাজিত হয়।
বিজয়নগর ও সুলতান রাজ্যগুলি প্রথম থেকেই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটানা লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রধানত রাজনৈতিক, সামরিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্যই এই লড়াই হয়েছিল।
৫। কল্পনা করে লেখো (১০০-১৫০টি শব্দের মধ্যে) : পূর্ণমান-৮
(ক) যদি তুমি সুলতান আলাউদ্দিন খলজির সময়ে দিল্লির একটি বাজারে যেতে তাহলে কেমন অভিজ্ঞতা হত তা লেখো।
উত্তর ঃ সুলতান আলাউদ্দিনের সময় দিল্লির বাজারদর নিয়ন্ত্রণ পুরাপুরি সামরিক শক্তির হাতে যথেষ্ট ছিল। আমি দিল্লির একটা বাজারে গিয়েছিলাম। তিনি বাজারের সমস্ত জিনিসের দর নির্দিষ্ট করে দেন। তিনি বাজারদর দেখাশোনা করার জন্য ‘শাহানা-ই-মান্ডি’ ও ‘দেওয়ান-ই-রিয়াসৎ' নামে দুই রাজকর্মচারী নিয়োগ করেন। আমার মতে, এটি একটি ভালো বিষয়। সুলতানের ঠিক করা দামের চেয়ে কোনো বিক্রেতা দাম বেশি নিলে এবং ক্রেতাকে ঠকালে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল।
আলাউদ্দিন মানুষের সুবিধার্থে রেশন ব্যবস্থা চালু করেন। প্রজারা যাতে সঠিক সময়ে খাদ্যশস্য ও দৈনন্দিন
প্রয়োজনীয় জিনিস পেতে পারে তাই সুলতানরা সবসময় তাদের কাছে তা মজুত রাখতেন। তাদের সঠিক সময়ে
প্রয়োজনীয় জিনিস জোগান দিতে সুলতানরা খুবই দায়িত্বশীল ছিলেন।
আমি বাজারে ঘুরে বুঝেছি যে, আলাউদ্দিন একজন যথেষ্ট দায়িত্বশীল সুলতান ছিলেন। তিনি ঠিকমতো বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করতেন। কেউ কাউকে ঠকালে তিনি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতেন এবং প্রত্যেকটা জিনিসের দাম
সঠিকভাবে বজায় রাখতেন। এসব দেখে আমি যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সঞ্জয় করলাম।
(খ) মনে করো তুমি আলাউদ্দিন হোসেনশাহের দরবারে একজন রাজকর্মচারী। সে যুগের ধর্মীয় অবস্থা সম্বন্ধে যদি তুমি একটি বই লিখতে তা হলে তাতে কী লিখতে?
উত্তর : আলাউদ্দিন হোসেনশাহ ছিলেন মধ্যযুগের বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি তাঁর উদারনীতির জন্য ছাব্বিশ বছরের দীর্ঘ শাসনকাল চালিয়েছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে হিন্দুদের দেওয়া হত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ।
হোসেনশাহের উজির, প্রধান চিকিৎসক এবং তার দেহরক্ষী সবাই ছিলেন হিন্দু। এমনকি টাকশালের অধ্যক্ষও ছিলেন একজন হিন্দু। হোসেনশাহ স্বভাবে ছিলেন খুবই ভদ্র, বিনয়ী এবং সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল।
হোসেনশাহ শ্রীচৈতন্যদেবের খুবই ভক্ত ছিলেন। সেইসময় নামকরা দুই ভাই রূপ ও সনাতন হোসেনশাহের রাজদরবারে ব্যক্তিগত সচিবের পদ পান। সাধারণ মানুষ হোসেনশাহকে দরবারে খুবই শ্রদ্ধা করত। অনেকে তাঁকে কৃষ্ণের অবতার বলে মনে করত। হোসেনশাহ বাংলাভাষায় লেখালেখির চর্চায় উন্নতি লাভ করেছিলেন। তাঁর আমলে সংস্কৃতিরও উন্নতি ঘটেছিল। তিনি দরবারে সবাইকে সমান নজরে দেখতেন। তাই তাঁর সম্পর্কে বই লিখতে গেলে খুবই মনে আনন্দ জাগবে। বাংলায় তাঁর মতো এক রাজার খুবই দরকার ছিল। হোসেনশাহ রাজা হিসেবে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন, এসব কথাই আমি আমার বইতে লিখব।
অনুশীলন বাইরে আরো কিছু প্রশ্ন
(ক) মোহম্মদ বিন তুঘলকের উত্তরসূরী ছিলেন .....। (ফিরোজ শাহ সৈয়দ/লোদি)
উত্তর: ফিরোজ শাহ
(খ) সৈয়দ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ----। (মোহম্মদ বিন তুঘলক/সিকান্দার লোদি/খিজির খান)
উত্তর: খিজির খান
(গ) পানিপতের প্রথম যুদ্ধ হয় ----- খ্রিস্টাব্দে। (১৫২৮/১৫২৫/১৫২৬)
উত্তর: ১৫২৬
(ঘ) ..... খ্রিস্টাব্দ থেকে উত্তর-পশ্চিমে বারবার মোঙ্গল আক্রমণ ঘটে। (১৯২২/ ১২২১/১২২০)
উত্তর:
(ঙ) দিল্লি বারবার আক্রান্ত হয় .... সময়ে। (মোহম্মদ বিন তুঘলক/আলাউদ্দিন খলজি/গিয়াসউদ্দিন বলবন)
উত্তর: আলাউদ্দিন খলজির
(চ) দিল্লির সুলতানরা সাম্রাজ্যের আয়তন ক্রমশ ... ছিলেন। (বাড়িয়ে/কমিয়ে/মাঝামাঝি)
উত্তর: বাড়িয়ে
(ছ) সুলতানকে পরামর্শ দিতেন ......। (উলেমা/অভিজাত /নাগরিক)
উত্তর: উলেমা
(জ) ইলিয়াসের রাজধানী ছিল ..…...। (পান্ডুয়া/দিল্লি/সাতগাঁ)
উত্তর: পাণ্ডুয়া
(ঝ) দুর্গ ঘিরে ছিল .. দুই শাখা নদী। (গঙ্গা/যমুনা/তিস্তা)
উত্তর: গঙ্গার
(ঙ) রাজা গণেশের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে .... সিংহাসনে বসেন। (যদু/আজম শাহ/সিকান্দর)
উত্তর-যদু
এককথায় উত্তর দাও :
(ক) সুলতানদের কে পরামর্শ দিতেন ?
উত্তর : উলেমা।
(খ) ইকতার দায়িত্বে কে থাকতেন?
উত্তর : সামরিক নেতা।
(গ) সৈয়দ বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
উত্তর : খিজির খান।
(ঘ) তুঘলক শাসকদের নাম খোদাই করার জন্য কী চালু রেখেছিলেন? উত্তর ঃ মুদ্রা
(ঙ) পানিপতের প্রথম যুদ্ধ কবে, কাদের মধ্যে হয়েছিল?
উত্তর ঃ ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপতে, বাবরের সঙ্গে ইব্রাহিম লোদির যুদ্ধ হয়।
(চ) রুমি কৌশল কী ?
উত্তর : পানিপতের যুদ্ধে বাবর তুর্কিদের থেকে শেখা এক ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। একে বলা হয় রুমি কৌশল।
(ছ) কে যুদ্ধে পটু ছিলেন?
উত্তর : বাবর।
(জ) কোথায় মোগলদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর : আগ্রায়।
সংক্ষেপে (৩০-৫০টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও :প্রতিটি প্রশ্নমান-৩]
(ক) সুলতান কে ?
উত্তর ঃ মোহম্মদ ঘুরির মৃত্যুর পর দিল্লিকে কেন্দ্র করে কুতুবউদ্দিন আইবক সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করলেন।
‘সুলতান' একটা উপাধি। তুর্কি শাসকরা অনেকেই এই উপাধি ব্যবহার করতেন। আরবি ভাষায় ‘সুলতান' শব্দের মানে ‘কর্তৃত্ব’, ‘ক্ষমতা'। সুলতানির প্রধান শাসক হলেন সুলতান।
(খ) হোসেন শাহের শাসনকাল বর্ণনা করো।
উত্তর ঃ সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ছিলেন মধ্যযুগের বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। তাঁর ছাব্বিশ বছরের দীর্ঘ শাসনকাল বিখ্যাত ছিল তাঁর উদারনীতির জন্য। তাঁর রাজত্বে হিন্দুদের দেওয়া হত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ।
আলাউদ্দিনের উজীর, প্রধান চিকিৎসক, তাঁর প্রধান দেহরক্ষী ও টাকশালের অধ্যক্ষ সবাই ছিলেন হিন্দু।
(গ) বিদেশি পর্যটকদের বিবরণীতে বিজয়নগর কেমন ছিল ?
উত্তর ঃ বিজয়নগর সাম্রাজ্যে বহু বিদেশি পর্যটক আসেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন ইটালির পর্যটক নিকোলো কন্টি, পারস্যের দূত আবদুর রাজ্জাক, পোর্তুগিজ পর্যটক পেজ ও নুনিজ, দুয়ার্তে বারবোসা প্রমুখ। এঁরা সকলেই বিজয়নগরের সম্পদ দেখে বিস্মিত হন। বিজয়নগর শহরটি সাতটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। কৃষিই ছিল জনসাধারণের প্রধান জীবিকা। কৃষির উন্নতির জন্য জলসেচের সুবন্দোবস্ত ছিল।
বিশদে (১০০-১২০টি শব্দের মধ্যে) উত্তর দাও :প্রতিটি প্রশ্নমান-৫]
(ক) সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবক সম্পর্কে যা জানো সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর ঃ ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে মোহম্মদ ঘোরির মৃত্যু হয়। এরপর কুতুবউদ্দিন গজনির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্কে ছিন্ন করেন এবং নিজেকে স্বাধীন শাসক রূপে ঘোষণা করেন। তিনি ১২০৮ খ্রিঃ ‘সুলতান' উপাধি ধারণ করেন। তাঁর সিংহাসন আরোহণের সময় থেকেই দিল্লিতে স্বাধীন ‘সুলতানি’ শাসনের সূচনা ঘটে। স্মিথ, এনফিলস্টোন প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ কুতুবউদ্দিন আইবক প্রতিষ্ঠিত দিল্লির রাজবংশকে 'দাস' (মামেলক) বংশ বলে অভিহিত করেছেন। অবশ্য অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই কথা যুক্তিসম্মত নয়। তাঁদের মতে, ভাগ্যচক্রে ক্রীতদাসরূপে জীবন শুরু করলেও এঁরা।অভিজাত বংশের সন্তান ছিলেন ও সুলতান হওয়ার আগে প্রত্যেকেই ক্রীতদাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন।
কৃতিত্ব ঃ সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবক মাত্র চার বছর রাজত্ব করেছিলেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি কোনো নতুন রাজ্য দখল করেননি। তবে স্বাধীন সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি একজন
সদাশয় ও দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। তাই তিনি ‘লাখবক্স' বা 'লক্ষদাতা' নামে সুবিদিত। তিনি খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকির স্মৃতির উদ্দেশ্যে দিল্লির উপকণ্ঠে একটি স্তম্ভ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। বর্তমানে এটি ‘কুতুবমিনার”
নামে ভারতের একটি বিশেষ দ্রষ্টব্য বস্তু হয়ে আছে।
(খ) সুলতানি যুগের ইতিহাস রচনার উপাদানগুলি সংক্ষেপে উল্লেখ করো।
উত্তর : ভারতের ইতিহাসে মধ্যযুগ যথাক্রমে সুলতানি যুগ ও মোগল আমল এই দুই অংশে বিভক্ত। প্রাচীন যুগের তুলনায় সুলতানি যুগের ঐতিহাসিক উপাদানের সংখ্যা অনেক বেশি। সুলতানি যুগের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলির মধ্যে অলবিরুনির তহকিক্-ই-হিন্দ, মিনহাজ উদ্দিন-সিরাজ রচিত স্তবক-ই-নাসিরি, জিয়াউদ্দিন বারনি রচিত তারিখ-ই-ফিরোজশাহি, আফ্রিকার পর্যটক ইবন বতুতার রাহলা বা সফরনামা, আমির খসরু রচিত খাজাইন-উল-ফুতু এবং ফিরোজশাহ মলকের আত্মজীবনী গ্রন্থ তহা-ই-ফিরোজশাহি উল্লেখযোগ্য। সুলতানি যুগে বিদেশ থেকে অলবিরুনি ও ইবন বতুতা ছাড়া অনেক পর্যটক বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন, যেমন—ইটালির মার্কোপোলো ও নিকালো কন্টি, রাশিয়ার পর্যটক আথানিসিউস নিকিতন ও পারস্যের আবদুর রাজ্জাক। আঞ্চলিক ভাষায় রচিত নানক ও কবিরের দোঁহা, বাংলা মঙ্গলকাব্য, তুকারামের ভক্তিগীতি প্রভৃতিতে সুলতানি যুগের সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবনের প্রতিফলন পড়েছিল।
(গ) অলবিরুনি সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর : অলবিরুনি ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মধ্য এশিয়ার খোয়ারিজম অথবা ঘিভা অসলে জন্মগ্রহণ করেন। সুলতান মামুদের ভারত অভিযানের সময় অলবিরুনি ভারতে আসেন। তিনি অসাধারণ পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ তহকিক-ই-হিন্দ এ (অলবিরুনির ভারত) ঐতিহাসিক ঘটনাবলি, হিন্দুদের স্বভাব-চরিত্র ও প্রথা সম্বন্ধে নিজের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করেন। তিনি ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। তিনি ‘ভগবৎ গীতা' পাঠ করে ভারতীয় দর্শন সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করেন। তিনি ছিলেন প্রথম মুসলমান ভারত-তত্ত্ববিদ। অলবিরুনি জ্যোতির্বিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র, অতীত ঘটনাবলির সময়ানুক্রম, গাণিতিক ভূগোল, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা ও খনিজ-বিদ্যা বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাঁর বিবরণ থেকে জানা যায় যে, ভারতে বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল, কিন্তু বিধবাবিবাহ চালু ছিল না। ক্ষত্রিয়দের মধ্যে সতীদাহ প্রথা চালু ছিল। হিন্দুদের মধ্যে দেবদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। এই সময় বিচারব্যবস্থাও উন্নত ছিল। ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি দেহত্যাগ করেন।
রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দাও : [প্রতিটি প্রশ্নমান-৮]
(ক) সুলতান রাজিয়া সম্পর্কে যা জানো লেখো।
উত্তর ঃ ১২১১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান কুতুবউদ্দিনের জামাই ইলতুৎমিশ দিল্লির সিংহাসনে বসেন। ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইলতুৎমিশ মারা যান। তাঁর ছেলেরা ছিল অকর্মণ্য। তাই মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর বিদুষী কন্যা রাজিয়াকে সিংহাসনের
উত্তরাধিকারিণী হিসেবে মনোনীত করে যান। কিন্তু দিল্লির অভিজাতবর্গ এবং ওমরাহরা স্ত্রীলোকের প্রভুত্ব স্বীকার অমর্যাদাকর মনে করে ইলতুৎমিশের ছেলে রুকনউদ্দিন ফিরোজকে সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু অপদার্থতা ও অযোগ্যতার কারণে চারদিকে বিদ্রোহ দেখা দিলে ওমরাহরা বাধ্য হয়ে রাজিয়াকে সিংহাসনে বসান ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে। রাজিয়া ছিলেন এক অসাধারণ-প্রতিভাসম্পন্ন নারী। তিনি পুরুষের পোশাকে দরবারে আসতেন এবং দক্ষতার সঙ্গে শাসনকাজের সবকিছু সম্পন্ন করতেন। সামরিক প্রতিভাও যথেষ্ট ছিল। তাঁর কর্মদক্ষতা ও অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় পেয়ে আমির-ওমরাহদের একদল তাঁর প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়ে উঠলেন। তাঁরা গোপনে রাজিয়ার বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু করলেন। সেইসময়ে ৪০ জন তুর্কি ওমরাহ রাজ্যের সর্বময় কর্তা হয়েছিলেন। এদের বলা হত চল্লিশ চক্র। এরা স্ত্রীলোকের শাসন পছন্দ না করে বিদ্রোহী হন। সরহিন্দের শাসনকর্তা ইক্তিয়ারউদ্দিন আন্তুনিয়া রাজিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। আল্তুনিয়াকে দমন করতে গিয়ে রাজিয়া পরাজিত ও বন্দি হলেন। এদিকে আমির-ওমরাহরা তাঁর অন্য এক ভাই মুইজউদ্দিন বাহরামকে দিল্লির সিংহাসনে বসালেন।
আবার, সুচতুর রাজিয়া সরহিন্দের শাসক আলতুনিয়াকে বিবাহ করে আনিয়ার সাহায্যে দিল্লির সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে অগ্রসর হলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মুইজউদ্দিনের হাতে উভয়েই পরাস্ত ও নিহত হলেন।
(খ) মোহম্মদ বিন তুঘলক কী কী প্রধান কাজ করেছিলেন ?
উত্তর ঃ প্রধান কাজ ঃ (১) বাড়তি কর সংগ্রহ করার জন্য দোয়াব অঞ্চলে রাজস্ব বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সুলতান। অনাবৃষ্টির ফলে সেখানে শস্যের ক্ষতি হয়েছিল। প্রজারা কর দিতে পারেননি। তারা বিদ্রোহ করে। সুলতান বাড়তি কর মকুব করেন।
নষ্ট হওয়া ফসলের জন্য ক্ষতিপুরণ দেন। কৃষকদের সাহায্য করার জন্য সুলতান তকাভি ঋণ দান প্রকল্প চালু করেছিলেন।
(২) দিল্লির অধিবাসীদের বিরোধিতা এবং মোঙ্গল আক্রমণের ভয় থেকে রক্ষা পেতে ও দাক্ষিণাত্যকে শাসন করতে দেবগিরিতে দ্বিতীয় রাজধানী তৈরি করেন। শহরের নতুন নাম হয় দৌলতাবাদ। সুলতানের হুকুমে দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে যেতে গিয়ে পথে অনেক মানুষ প্রাণ হারান। কয়েকবছর পরে সুলতান আবার রাজধানী দৌলতাবাদ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যান দিল্লিতে। (৩) মূল্যবান ধাতু সোনা ও রুপোর ঘাটতি মেটাতে তামার মুদ্রা চালু করেন। সুলতান। ওই মুদ্রা যাতে জাল না করা যায় তার জন্য আগে থেকে তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। অনেকে তামার মুদ্রা জাল করে। জাল মুদ্রা তুলে নিতে রাজকোষ থেকে অনেক সোনা ও রুপার মুদ্রা ব্যয় করতে বাধ্য হন সুলতান। (৪) তার সুলতান কয়েকজন অনাভিজাত সাধারণ ব্যক্তিকে প্রশাসনের উঁচু পদে বসিয়েছিলেন।
