মেটারনিখ ব্যবস্থার পরিচয় দাও এবং এই ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণগুলি কি কি ছিল লেখোও - school book solver

Tuesday, 12 May 2026

মেটারনিখ ব্যবস্থার পরিচয় দাও এবং এই ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণগুলি কি কি ছিল লেখোও

 


প্রশ্ন: মেটারনিখ ব্যবস্থার পরিচয় দাও। ।মেটারনিখ ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণ কী ছিল?


উত্তর > প্রথম অংশ : অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স মেটারনিখ ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত ভাবধারাগুলিকে দমন করতে এবং প্রাক্-বৈপ্লবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তাকেই মেটারনিখ ব্যবস্থা বলা হয়।

মেটারনিখ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য : এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্যগুলি হল –(১) ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত প্রগতিশীল ভাবনাগুলিকে (উদারতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ) ধ্বংস করা, (২) ইউরোপের রাজনীতিতে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখা, (৩) ভিয়েনা চুক্তির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা করা, (৪) শক্তিসমবায়কে ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত ভাবধারাগুলিকে দমন করতে কাজে লাগানো ।

ডেভিড টমসনের মতে, মেটারনিখ ব্যবস্থা ছিল অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার এক মাস্টার প্ল্যান' হল-

মেটারনিখ ব্যবস্থা : মেটারনিখ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকগুলি

১ রক্ষণশীলতা : মেটারনিখ ছিলেন রক্ষণশীল। তাঁর মতে, পুরাতনতন্ত্রই হল সম্পদ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রকৃত ভিত্তি।

এজন্য তিনি প্রাক-ফরাসি বিপ্লবযুগের বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র, যাজকতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, গির্জাতন্ত্রের পুনঃস্থাপনের জন্ নানারকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

২ দমননীতি : নির্বিচার দমননীতি অনুসরণ করে অস্ট্রিয়ার জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপকে কঠোর হাতে দমন করেন।

পাশাপাশি ইতালি ও জার্মানির জাতীয়তাবাদকে দমন করতেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

[৩] বিভাজন ও শাসন নীতি ; অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যে জাতিগত ও অন্যান্য সুযোগ গ্রহণ করে তিনি বিভাজন ও শাসননীতি প্রয়োগ করেন।

 [৪] বিপ্লবী আন্দোলন দমন: ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মেটারনিখ ব্যবস্থা ইউরোপে আন্তর্জাতিক পুলিশের কাজ করে। মেটারনিখ ইউরোপে বিপ্লবের সম্ভাবনা দূর করার জন্য ইউরোপীয় শক্তিসমবায়ের সাহায্য নেন। দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে বিপ্লবী আন্দোলন দমন করার জন্য সামরিক সাহায্য প্রেরণ করেছিলেন।

সাফল্য : ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মেটারনিখ পদ্ধতি যে ইউরোপে সাফল্য লাভ করেছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই—(১) মেটারনিখ পদ্ধতি ইউরোপ থেকে যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করেছিল। (২) ইউরোপে প্রায় চল্লিশ বছর শান্তিরক্ষার চেষ্টা করে মেটারনিখ যুগের দাবিকে পূরণ করেছিলেন। (৩) বহুজাতি অধ্যুষিত অস্ট্রিয়ার সংহতি রক্ষিত হয়েছিল। (৪) এই সঙ্গে ইউরোপের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি ঘটে।

দ্বিতীয় অংশ :

ব্যর্থতার কারণ : মেটারনিখ ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণগুলি

হল-

১ দূরদর্শিতার অভাব : মেটারনিখের নীতি ছিল প্রতিক্রিয়াশীল, সংকীর্ণ, সুবিধাবাদী ও অদূরদর্শী। এ কারণেই

তিনি দমনপীড়ন নীতির মাধ্যমে তার ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারেননি।

২ আন্দোলন দমন : ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত নানা ভাবনা বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে তিনি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন।

৩. যুগবিরোধী : ফরাসি বিপ্লব যে-নতুন যুগের সূচনা করেছে তা মেটারনিখ বুঝতে পারেননি। তিনি যুগধর্মকে উপেক্ষা করে পিছিয়ে-পড়া পুরোনো নীতিগুলিই আঁকড়ে ধরে রাখেন।

৪ প্রগতিবিরোধী : তাঁর সংস্কারবিরোধী নীতির দ্বারা ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রগতির স্রোত রুখে দিয়ে কূটনীতিক হিসেবে তিনি সফল হলেও রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ব্যর্থ হন ।

৫ সংস্কার বিমুখতা : মেটারনিখ ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য ছিল কোনো সংস্কার বা পরিবর্তন না করেই শাসন চালানো বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। তাঁর এই অতিরিক্ত রক্ষণশীলতা

ও সংস্কারবিমুখতা ছিল তাঁর ব্যবস্থা ধ্বংসের অন্যতম কারণ।

৬ ফেব্রুয়ারি বিপ্লব : ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ও অস্ট্রিয়া ও জার্মানিতে মেটারনিখ ব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।

৭ অসহযোগিতা : মেটারনিখ ব্যবস্থাকে ইউরোপের সমস্ত দেশ চোখ বন্ধ করে মেনে নেয়নি। কারণ, ইংল্যান্ড ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে, রাশিয়া ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে এবং ফ্রান্স ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এই নীতি থেকে সরে যায়।

উপসংহার : মেটারনিখের ব্যর্থতা সত্ত্বেও এ কথা অনস্বীকার্য যে, যতদিন মেটারনিখের হাতে ক্ষমতা ছিল, ততদিন ইউরোপে শান্তি বজায় ছিল। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের আঘাতে তিনি অস্ট্রিয়া ছেড়ে ইংল্যান্ডে পালিয়ে যান। তাঁর ব্যর্থতা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, হয় অনেক আগে এই পৃথিবীতে এসেছি, নয় অনেক পরে এসেছি।