মেটারনিখ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য সহ সাফল্য আলোচনা কর । নবম শ্রেণীর ইতিহাস
প্রশ্ন : মেটারনিখ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি কী? এই ব্যবস্থার সাফল্য আলোচনা করো।
উত্তর সংকেত : প্রথম অংশ : মেটারনিখ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য :
(১) প্রগতিশীল ভাবধারার ধ্বংসসাধন, (২) আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি ধুলিসাৎ, (৩) ন্যায্য অধিকার নীতি,
(৪) সংস্কার বিরোধিতা,
(৫) স্বাধীনতা হরণ,
(৬) অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য রক্ষা
করা, (৭) শক্তি সমবায়ের ব্যবহার।
দ্বিতীয় অংশ : সাফল্য :
(১) শাস্তি প্রতিষ্ঠা, (২) অস্ট্রিয়ার স্বার্থরক্ষা, (৩) সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি উপসংহার।
উত্তর » প্রথম অংশ: অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলার তথা ইউরোপের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ প্রিন্স মেটারনিখ ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত ভাবধারাগুলিকে দমন করতে এবং প্রাক্-বৈপ্লবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তাকেই
মেটারনিখ ব্যবস্থা বলা হয়।
মেটারনিখ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য :
১ প্রগতিশীল ভাবধারার ধ্বংসসাধন: ফরাসি বিপ্লবের ফলে গড়ে ওঠা উদারতন্ত্রী তথা প্রগতিশীল ভাবধারার (উদারতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ) তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি। তিনি মনে
করতেন, ফরাসি বিপ্লবের ফলে তৈরি হওয়া ভাবধারাগুলি সমাজ ও সভ্যতার ধ্বংসসাধনকারী। তাই এই দুষ্ট ক্ষতকে উত্তপ্ত লৌহশলাকা দ্বারা দুর করতে হবে।
(২) আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি ধূলিসাৎ : ফরাসি বিপ্লব প্রত্যেক জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি প্রতিষ্ঠা করেছিল। মেটারনিখ বুঝতে
পেরেছিলেন, এ দাবি শুধুমাত্র ফ্রান্সের সীমানায় আটকে না-থেকে খুব তাড়াতাড়ি অস্ট্রিয়াকেও গ্রাস করবে এবং অস্ট্রিয়া খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। তাই যে-কোনো মূল্যে তিনি বিপ্লবকে ধ্বংস করতে
উদ্যোগী হন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি উড়িয়ে দেন।
[৩] ন্যায্য অধিকার নীতি : মেটারনিখ ন্যায্য অধিকার নীতি প্রয়োগ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফরাসি বিপ্লবের আগের রাজবংশ ও রাজাদের ফিরিয়ে এনে বিপ্লব পূর্ববর্তী ইউরোপ প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেন।
[৪] সংস্কার বিরোধিতা : মেটারনিখ ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সংস্কার বিরোধিতা ও কোনো পরিবর্তন না-করা।
সেজন্য তিনি বলতেন রাজত্ব করুন কিন্তু কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার করবেন না।
[৫] স্বাধীনতা হরণ : মেটারনিখ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাক্স্বাধীনতা হরণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ওপর কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন, রাজনৈতিক সভাসমিতি নিষিদ্ধ
করেন এবং শিক্ষক ও ছাত্রদের ওপর গোয়েন্দাদের নজরদারি বৃদ্ধি করেন।
[৬] অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য রক্ষা করা: ইউরোপের রাজনীতিতে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য রক্ষা করা ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ ছাড়াও তিনি অভিজাততন্ত্র, সামন্ততন্ত্র ও চার্চতন্ত্রকে পূর্ণ সমর্থন জানান।
[৭] শক্তি সমবায়ের ব্যবহার : ইউরোপীয় শক্তিসমবায়কে বিপ্লবপ্রসূত ভাবধারা দমনের কাজে লাগান। ভিয়েনা চুক্তির
ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষাও করেন।
দ্বিতীয় অংশ :
• সাফল্য : নানাভাবে সমালোচিত হলেও মেটারনিখ ব্যবস্থার
সাফল্যকে অস্বীকার করা যায় না, কারণ—
[১] শান্তি প্রতিষ্ঠা : এই ব্যবস্থার ফলে দীর্ঘদিন প্রায় চল্লিশ বছর ইউরোপ থেকে যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর হয়েছিল।
[২[ অস্ট্রিয়ার স্বার্থরক্ষা : বহু জাতি অধ্যুষিত অস্ট্রিয়ার সংহতি রক্ষা পেয়েছিল এবং ইউরোপের রাজনীতিতে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য বৃদ্ধি পেয়েছিল।
[৩] সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি : এইসময় ইউরোপে শান্তি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা হলে শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্যের সমৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটে।
উপসংহার : ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মেটারনিখ;ছিলেন সমগ্র ইউরোপীয় রাজনীতির মুখ্য নিয়ন্ত্রক। সেই কারণেই
এই সময়কালকে বলা হয় মেটারনিখ যুগ।
