একটি শহরের আত্মকথা রচনা - school book solver

Tuesday, 20 October 2026

একটি শহরের আত্মকথা রচনা

 




প্রবন্ধ-রচনা

একটি শহরের আত্মকথা


ভূমিকা : আমি একটি শহর। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত আমি। আমার নাম আসানসোল। এটি একটি অনার্য নাম। শুকনো কাঁকুড়ে মাটি, বিস্তর ঝোপজঙ্গল আর উঁচু-নীচু অসমতল ভূমি দিয়ে আমার সর্বাঙ্গ তৈরি। অহল্যার মতো পাষাণ হয়ে বহুদিন নিঃসঙ্গ কাটিয়েছিলাম আমি। অনাদৃত হয়ে পড়েছিলাম বছরের পর বছর। যেন গভীর ঘুমে ঘুমিয়েছিলাম।


জন্ম ইতিহাস:  গাঁইতি দিয়ে খোঁড়াখুড়ির শব্দে আর বাষ্পীয় রেলইঞ্জিনের ভোঁ শুনে আমার ঘুম ভাঙল। সে প্রায় দেড়শো বছর আগেকার কথা। শোনা গেল, আমার পাশে রানিগঞ্জে পাওয়া গেছে কয়লার খনি। সে খনির বিস্তার আমার ধারে-কাছে, বলা চলে আশেপাশে সর্বত্র। এই কয়লা হল আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার প্রাণভোমরা। দূরদূরান্ত থেকে এসে গেল লোভী বণিকের দল। কয়লা নামক কালো হিরে সংগ্রহের জন্য তখন সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওই কয়লা জ্বালানো হবে নতুন নতুন শিল্পকে গড়ে তুলতে। রাজধানী কলকাতা থেকে পাতা হয়ে গেল রেললাইন। আমার বুকে একটি রেলওয়ে ডিভিশন। রেলকর্মীদের জন্য তৈরি হল কয়েক হাজার কোয়ার্টার, অফিস, সেইসঙ্গে এক বিরাট জনবসতিও গড়ে উঠল।


শহর নামকরণ:  ওই রেলের ভোঁ শুনেই আমার শহরজীবনের জন্ম। ভোঁ নয়, এটি হল আমার জন্মমুহূর্তের শঙ্খধ্বনি। ভারতের ইতিহাসে আমার আসানসোল নামটি চিরকালের মতো নথিভুক্ত হয়ে গেল। এরপর থেকে আর আমাকে কখনও পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। কেবল রেলযোগে নয়, আমার বুক চিরে একটি নদীর মতো চলে গেছে শেরশাহের সেই ইতিহাস-বিশ্রুত গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড, এটি এখন অন্যতম প্রধান জাতীয় সড়ক।

 শিল্পনগরী:  সুকুমার রায়ের ‘হ য ব র ল'-এর সেই বিখ্যাত বাক্যটি এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায়। ছিলাম রুমাল, হয়ে গেলাম বেড়াল। ছিলাম কাঠফাটা রোদে পোড়া রুক্ষ পতিত জমি, হয়ে গেলাম এক জনবসতিপূর্ণ কোলাহলমুখর বিরাট শহর। আবার যেমন-তেমন শহর নয়, একেবারে শিল্পনগরী।

জনবসতি : শোনা যায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবক্ষয় বাড়ে। আমার বেলায় কিন্তু তা বলা যায় না। আমাকে ঘিরে আজও নতুন নতুন কলকারখানার সৃষ্টি হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে শিল্প। রানিগঞ্জ থেকে বার্নপুর, কুলটি সবই আমাকে ঘিরে আবর্তিত। আমাকে ঘিরে শত শত কারখানা। কাগজ তৈরি, সাইকেল নির্মাণ, ওয়াগন তৈরি, গ্লাস ফ্যাক্টরি, ইস্পাত তৈরি এবং এইসঙ্গে খনি থেকে কয়লা উত্তোলন, ওষুধ তৈরি ইত্যাদি অজস্র কাজে লক্ষ লক্ষ লোক এখানে এসে জীবিকানির্বাহ করছে। এখানে সর্বধর্ম, ভাষা, প্রদেশ মিশে একাকার হয়ে গেছে। বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের সহাবস্থানে এখানে এক মিশ্র সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। মন্দির, মসজিদ সঙ্গে রয়েছে গির্জাও।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসার:  আমার বুকে গড়ে উঠেছে বিস্তর স্কুল। ইংরেজি-বাংলা-হিন্দি-উর্দু ইত্যাদি ভাষাশিক্ষার ব্যবস্থাও এখানে রয়েছে। রয়েছে একটি মহিলা কলেজসহ আরও দুটি ডিগ্রি কলেজ। কেবল লেখাপড়া নয়, স্বাস্থ্য পরিসেবাও আমার এখানে সহজলভ্য। বড়ো বড়ো হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে এই শিল্পনগরী ঠাসা। সব শ্রেণির মানুষের চিকিৎসার সুব্যবস্থা আছে।

উপসংহার:  শহর কলকাতা থেকে দূরে পড়ে আছি বলে, আমাকে কখনও যেন অনুন্নত এবং উপেক্ষিত ভেবো না। আমি আসানসোল, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম শিল্পনগরী রূপে আমাকে অনেকেই ভালোবাসে। আমার সঙ্গী সাথী অর্থাৎ আমার বুকে গজিয়ে ওঠা কলকারখানা গুলো হয়তো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধোঁয়া নির্গত করে তোমাদের অসুবিধা সৃষ্টি করে। এর জন্য আমি ক্ষমা চাইছি। কি করবো বলো ? যদি কল কারখানা গুলো বন্ধ করে দিই তাহলে হয়তো তোমাদের কর্ম জীবন অনেক নষ্ট হয়ে যাবে। আমার শেষ ইচ্ছা তোমাদের মনে  আমি শিল্প নগরী হয়ে বেঁচে থাকতে চাই। তোমরা যদি আমাকে মনে রাখো আমি খুশিমনে জীবন কাটিয়ে দিতে পারব।