পঞ্চতন্ত্রের দুটি গল্প সিংহ ও খরগোশ এবং উকুন ও ছারপোকা - school book solver

Monday, 25 May 2026

পঞ্চতন্ত্রের দুটি গল্প সিংহ ও খরগোশ এবং উকুন ও ছারপোকা

 


পঞ্চতন্ত্রের গল্প

 সিংহ ও খরগোশ


বিশাল এক বন। সেই বনে বাস ছিল বিভিন্ন পশুর। এক শক্তিশালী সিংহ বাস করত সেই বনে। সকল পশুরা

তাকে খুব ভয় পেত। সিংহের গায়ের জোর অন্যান্য পশুদের থেকে বেশি থাকায় যাকেই সে সামনে পেত তাকেই হত্যা করে নিজের খিদে মেটাত। সিংহ হয়ে উঠল পশুদের রাজা। সিংহের হাত থেকে বাঁচবার জন্য বনের সকল পশুরা আয়োজন করল এক সভার। অনেক আলাপ আলোচনার পর শিয়াল বলল, এক কাজ করা যাক। সিংহরাজকে আর শিকার করতে বনে আসতে হবে না। আমরা রোজ এক একজন তার গুহায় যাব, তিনি আমাদের মেরে খাবেন। শিয়ালের কথায় খুশি হয়ে তা মেনে নিল সকলে। সিংহকে এই কথা বলতে সে তো খুব খুশি। কষ্ট করে আর যেতে হবে না বনে। গুহাতে বসেই রোজ মহাভোজ হবে। প্রতিদিন একটা করে পশু হয় সিংহের শিকার। মহানন্দে কাটছে সিংহের দিন।

একদিন এল ছোটো একটি খরগোশের পালা। তার বুড়ো বাবা-মা ছেলের মৃত্যুর চিন্তায় হয়ে পড়ল শোকাহত। খরগোশ তাদের বলল, ভয় পেয়ো না তোমরা। আজ। আমি সিংহের পেটে যাব না। আজ সিংহেরই হবে মৃত্যুদিন।

পঞ্চতন্ত্রের মন্ত্রবাবা-মাকে সান্ত্বনা দিলেও মনে মনে সে খুবই ভয় পেল। তার থেকে বড়ো বড়ো পশুরাও সিংহের শিকার হয়েছে, সে তো কোন ছার। এদিক-ওদিক তাকিয়ে চলত চলতে হঠাৎ পথের পাশে সে দেখল একটা কুয়ো। কুয়োর ভেতর তাকাতেই সে দেখতে পেল নিজের ছায়া। সিংহকে বধ করার জন্য মাথায় এল তার একটা দুষ্টু মতলব।

ছুটে এল খরগোশ পশুরাজের কাছে।

কী রে এত দেরি কেন খরগোশ? গর্জন করে উঠল সিংহ। আমি তো আপনার কাছেই আসছিলাম। হঠাৎ কী হল জানেন, অন্য একটা সিংহ আমার পথ আটকে দিল।

কী— অন্য সিংহ? এত স্পর্ধা কার, দাঁড়া তো দেখি।

জানি না পশুরাজ। আমি যখন বললাম আমি এই বনের রাজার কাছে যাচ্ছি, সে বলল, কী? আমিই এই বনের রাজা। আহার করতে হয় আমিই তোকে করব, আর কেউ নয়।

চল তো দেখি, কার এত সাহস, বলে কী না সে এই বনের রাজা। দাঁড়া, ব্যাটাকে বধ করে আসি।

মনের আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে চলল খরগোশ কুয়োর দিকে। কুয়োর কাছে এসে বলল খরগোশ — উকি দিয়ে দেখুন, ওই সিংহটাকে দেখতে পাবেন।

কুয়োর জলে সিংহের নিজের ছায়া পড়ল। পশুরাজ রাগে গর্জন করতে লাগল।

ছায়ার সিংহটিকেও মনে হল গর্জন করছে। রাগে গজগজ করতে করতে জলে ঝাঁপ দিল পশুরাজ অপর সিংহটিকে বধ করতে। পশুরাজ বুঝতে পারল না কুয়োর জলে যে সিংহকে দেখছেন সেটি আর কেউ নয়— তারই নিজের ছায়া। জলে ঝাঁপ দেবার সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেল পশুরাজ সিংহ।

প্রাণে বেঁচে গেল খরগোশ। অন্য সকল পশুদের খবর দিতে তারা ফেলল স্বস্তির নিশ্বাস। বুদ্ধির জোরে সামান্য একটা খরগোশ হারিয়ে দিল পশুরাজ সিংহকে।


■■■■

উকুন ও ছারপোকা

মন্দবিসপিনী নামে একটি উকুন বাস

কত রাজার তুলতুলে নরম, আরামদায়ক বিছানার চাদরের নীচে। রাজার মধুর মতো মিষ্টি রক্ত পান করে করে বেশ সুখেই তার দিন কাটছিল। একদিন সেখানে হঠাৎ হাজির হল একটা ছারপোকা। ছারপোকাকে দেখে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে উকুন বলল, বাঁচাতে চাও তো পালাও। এই বিছানা স্বয়ং রাজার। একবার তোমায় দেখলে এখুনি

তোমার মৃত্যু ঘটবে।

অগ্নিমুখ নামের ছারপোকাটি বলল, ভরদুপুরে অতিথিকে এভাবে তাড়িয়ে দিয়ো না। জোলো রক্ত, তেতো রক্ত অনেক রকমেরই রক্ত পান করেছি। তুমি যদি অনুমতি দাও রাজার গায়ের আঠার মতো ঘন আর মধুর মতো মিষ্টি রক্ত পান করে জীবন সার্থক করি।

মন্দবিসর্পিনী ছারপোকার কথায় খুশি হয়ে বলল, তুমি আমার অতিথি, দু-একদিন থাকো আমার সঙ্গে। রাজামশাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি ধীরে ধীরে রাজার রক্ত পান করি। তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে রাজার রক্ত পান কোরো, না হলে নির্ঘাৎ বিপদ হবে।

অগ্নিমুখ বলল, কোনো চিন্তা করো না, আমি তোমার নির্দেশ মতোই সব কাজ করব। রাজামশাই রাত্তিরে এসে বিছানায় শুতেই অগ্নিমুখ অস্থির হয়ে উঠল। উকুনের সব উপদেশ বেমালুম ভুলে গিয়ে রাজার হাতের ওপর দিল এক কামড়। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠে রাজা সব দাসদাসীদের ডাক দিলেন। রাজা বললেন, দেখো তো বিছানায় পিঁপড়ে বা ছারপোকা আছে। কুট করে কামড়ে আমায় জ্বালিয়ে দিয়েছে।

ব্যতিব্যস্ত হয়ে দাসদাসীরা বিছানার চাদর উলটে ফেলল। অগ্নিমুখ কামড় দিয়েই পালং-এর খাঁজের মধ্যে লুকিয়েছিল। মন্দবিসর্পিনী চাদরের ভাঁজে থাকায় সহজেই ধরা পড়ল। রাজার দুই খাস চাকর আঙুলের মাঝে টিপে তার মৃত্যু ঘটাল।


■■■■■