রূপকথার গল্প কানকাটা রাজার দেশ - school book solver

Thursday, 21 May 2026

রূপকথার গল্প কানকাটা রাজার দেশ

 


         রূপকথার গল্প

     কানকাটা রাজার দেশ

        অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এক ছিল রাজা আর তাঁর ছিল মস্ত বড় দেশ। তার নাম হল কান কাটার দেশ। সেই দেশের সকলেরই কান কাটা। হাতি, ঘোড়া, ছাগল, গরু, মেয়ে, পুরুষ, গরিব, বড় মানুষ সকলেরই।কান কাটা। বড়লোকদের এক কান, মেয়েদের এক কানের আধখানা, আর যত জীব-জন্তু, গরিব-দুঃখীদের দুটি কানই কাটা থাকতো। সে দেশে এম।কেউ ছিল না যার মাথায় দুটি আস্ত কান ছিল, কেবল সেই কান কাটা দেশের রাজার মাথায় একজোড়া আস্ত কান ছিল। আর সকলেই লম্বা চুল দিয়ে, কেউ চাপদাড়ি দিয়ে, কেউ বা বিশ গজ মলমলের পাগড়ি দিয়ে কাটা কান ঢেকে রাখত, কিন্তু সেই রাজা মাথা একেবারে ন্যাড়া করে সেই ন্যাড়া মাথায় জরির তাজ চাপিয়ে গজমোতির বীরবৌলিতে দুখানা কান সাজিয়ে সোনার রাজ-সিংহাসনে বসে থাকতেন ।

একদিন সেই রাজা এক কান মন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কান কাটা ঘোড়ায় চেপে শিকারে বের হলেন। শিকার আর কিছুই নয়, কেবল জন্তু-জানোয়ারের কান কাটা। রাজ্যের বাইরে এক বন ছিল, সেই বনে কান কাটা দেশের রাজা আর এক কান মন্ত্রী কান শিকার করে বেড়াতে লাগলেন। এমনি শিকার করত করতে বেলা যখন অনেক হল, সূর্যদেব মাথার উপর উঠলেন, তখন রাজা আর মন্ত্রী এক প্রকাণ্ড বটগাছের তলায় ঘোড়া বেঁধে, শুকনো কাঠে আগুন করে যত জীবজন্তুর শিকার করা কান রাঁধতে লাগলেন। মন্ত্রী রাঁধতে লাগলেন আর রাজা খেতে লাগলেন, মন্ত্রীকেও দু-একটা দিতে লাগলেন। এমনি করে দুজনে খাওয়া শেষ করে সেই গাছের তলায় শুয়ে আরাম করছেন, রাজার চোখ বুজে এসেছে, মন্ত্রীর বেশ নাক ডাকছে, এমন সময় একটা বীর হনুমান সেই গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ে রাজাকে বললেন, 'রাজা তুই বড় দুষ্টু, সকলের কান কেটে বেড়াস, আজ সকালে আমার কান কেটেছিস, তার শাস্তি ভোগ কর।' এই বলে রাজার দুই গালে দুটো চড় মেরে একটা কান ছিঁড়ে দিয়ে চলে গেল। রাজা যাতনায় অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। অনেকক্ষণ পরে যখন জ্ঞান হল, তখন রাজা চারদিকে চেয়ে দেখলেন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, হনুমানটা কোথাও নেই, মন্ত্রীবর পড়ে পড়ে নাক ডাকাচ্ছেন। রাজার এমনি রাগ হল যে তখনি মন্ত্রীর কানটা এক টানে ছিঁড়ে দেন, কিন্তু অমনি নিজের কানের কথা মনে পড়লো, রাজা দেখলেন ছেঁড়া কানটা ধূলায় পড়ে আছে। তাড়াতাড়ি সেটিকে তুলে নিয়ে সযত্নে পাতায় মুড়ে পকেটে রেখে, তাজ টুপির সোনার জরির ঝালর কাটা-কানের উপর হেলিয়ে দিলেন যাতে কেউ কাটা-কান দেখতে না পায়। তারপর মন্ত্রীর পেটে গুঁতো মেরে বললেন, ঘোড়া আনো ।

এক গুঁতোয় মন্ত্রীর নাকডাকা হঠাৎ বন্ধ হল, আর এক গুঁতোয় মন্ত্রী লাফিয়ে উঠে রাজার সামনে ঘোড়া হাজির করলেন। রাজা কোনো কথা না বলে একটি লাফে ঘোড়ার পিঠে চড়ে একদম ঘোড়া ছুটিয়ে রাজবাড়িতে হাজির। সেখানে তাড়াতাড়ি সহিসের হাতে ঘোড়া দিয়েই একেবারে শয়নঘরে খিল দিয়ে পালঙ্কে আবার অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।

সকাল হয়ে গেল, রাজবাড়ির সকলের ঘুম ভাঙল, রাজা তখনও ঘুমিয়ে আছেন। রাজার নিয়ম ছিল রাজা ঘুমিয়ে থাকতেন আর নাপিত এসে দাড়ি কামিয়ে দিত, সেই নিয়মমতো সকালবেলায় নাপিত এসে রাজার দাড়ি কামাতে আরম্ভ করল। এক গাল কামিয়ে যেই আর এক গাল কামাতে যাবে এমন সময় রাজা ‘দুর্গা-দুর্গা' বলে জেগে উঠলেন। নজর পড়ল নাপিতের দিকে, দেখলেন নাপিত ক্ষুর হাতে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ কানে হাত দিয়ে দেখলেন, কান নেই। রাজা আপশোসে কেঁদে উঠলেন। কাঁদতে-কাঁদতে নাপিতের হাত ধরে বললেন, 'নাপিত ভায়া, একথা প্রকাশ করো না।

তোমাকে অনেক ধনরত্ন দেব।' নাপিত বললে, 'কার মাথায় দুটো কান যে একথা প্রকাশ করবে।' শুনে রাজা খুশি হলেন। নাপিতের কাছে আর আধখানা দাড়ি কামিয়ে তাকে দু-হাতে দু-মুঠো মোহর দিয়ে বিদায় করলেন।

নাপিত মোহর নিয়ে বিদায় হল বটে কিন্তু তার মন সেই কাটা কানের দিকে পড়ে রইল। কাজে-কর্মে, ঘুমিয়ে-জেগে কি লোকের দাড়ি কামাবার সময়, কি সকাল, কি সন্ধ্যে মনে হতে লাগল, রাজার কান কাটা, রাজার কান কাটা।

কিন্তু কারুর কাছে একথা মুখ ফুটে বলতে পারে না—মাথা কাটা যাবে।

নাপিত জাত সহজেই একটু বেশি কথা কয়, কিন্তু পাছে অন্য কথার সঙ্গে কানের কথা বেরিয়ে পড়ে সেই ভয়ে তার মুখ একেবারে বন্ধ হল। কথা কইতে না পেরে পেট ফুলে তার প্রাণ যায় আর কি?

এমন সময় একদিন রাজা নাপিতের কাছে দাড়ি কামিয়ে সোনার কৌটো খুলে কাটা কানটি নেড়ে চেড়ে দেখছেন আর অমনি কোত্থেকে একটা কাক ফস্ করে এসে ছোঁ মেরে রাজার হাত থেকে কানটি নিয়ে উড়ে পালাল। রাজা বললেন, হাঁ হাঁ হাঁ ধরো ধরো। কাকে কান নিয়ে গেল।'

তারপর রাজা মাথা ঘুরে সেইখানে বসে পড়লেন। ভাবতে লাগলেন,প্রজাদের কাছে কী করে মুখ দেখাব।

এদিকে নাপিত ক্ষুর ভাঁড় ফেলে দৌড়। পড়ে—তো—মরে এমন। দৌড়। শহরের লোক বলতে লাগল, 'নাপিত ভায়া নাপিত ভায়া, হল কী?

পাগলের মত ছুটছ কেন?”

নাপিত না রাম না গঙ্গা, কাকের সঙ্গে ছুটতে ছুটতে একেবারে অজগর বনে গিয়ে হাজির। কাকটা একটা অশ্বত্থ গাছে বসে আবার উড়ে চলল, কিন্তু নাপিত আর এক পা চলতে পারলে না, সেই গাছের তলায় বসে পড়ে হাঁফাতে লাগল, আর ভাবতে লাগল, ‘এখন কী করি? রাজার কান কাটা ছিল, তখন অনেক কষ্টে সে কথা চেপে রেখেছিলুম, এখন সেই কান কাকে নিলে একথাও যদি আবার চাপতে হয় তাহলে আমার দফা একদম

রফা! ফোলা পেট এবারে ফেঁসে যাবে। এখন করি কী?' নাপিত এই কথা ভাবছে, এমন সময় গাছ বললে, 'নাপিত ভায়া ভাবছ কী?'

নাপিত বললে, 'রাজার কথা।'

গাছ বললে, 'সে কেমন?'

তখন নাপিত চারিদিকে চেয়ে চুপি চুপি বললে-

'রাজার কান কাটা ।

তাই নিলে কাক ব্যাটা।'

এই কথা বলতেই নাপিতের ফোলা পেট একেবারে কমে আগেকার মত হয়ে গেল। বেচারা বড়ই আরাম পেল, এক আরামের নিঃশ্বাস ফেলে মনের ফূর্তিতে রাজবাড়িতে ফিরে চলল।

নাপিত চলে গেলে বিদেশী একটুলি সেই গাছের তলায় এল। এসে দেখলে গাছটা যেন আস্তে আস্তে দুলছে, তার সমস্ত পাতা থর থর করে কাঁপছে, সমস্ত ডাল মড় মড় করছে আর মাঝে মাঝে বলছে—

'রাজার কান কাটা ।

তাই নিলে কাক ব্যাটা।'

ঢুলি ভাবলে, এত বড় মজার গাছ, এরই কাঠ দিয়ে একটা ঢোল তৈরি করি। এই বলে একখানা কুড়ুল নিয়ে সেই গাছ কাটতে আরম্ভ করলে।

গাছ বললে, 'ঢুলি, ঢুলি, আমায় কার্টিসনে।'

আর কাটিসনে! এক, দুই, তিন কোপে ডাল কেটে নিয়ে, ঢোল তৈরি

করে। ‘রাজার কান কাটা’ 'রাজার কান কাটা' বাজাতে বাজাতে ঢুলি কান কাটা শহরের দিকে চলে গেল।

এদিকে কান কাটা শহরের রাজা কান হারিয়ে মলিন মুখে বসে আছেন আর নাপিতকে বলছেন, 'নাপিত ভায়া একথা যেন প্রকাশ না হয়।' নাপি বলছে, ‘মহারাজ কার মাথায় দুটো কান যে একথা প্রকাশ করবে। এমন

সময় রাস্তায় ঢোল বেজে উঠল—

'রাজার কান কাটা।

তাই নিলে কাক ব্যাটা।'

রাজা রাগে কাঁপতে কাঁপতে উঠে নাপিতের চুলের মুঠি এক হাতে আর অন্য হাতে খাপ-খোলা তরোয়াল ধরে বললেন, 'তবে রে পাজি। তুই নাকি একথা প্রকাশ করিসনি? শোন্ দেখি ঢোলে কী বাজছে। নাপিত শুনলে ঢোলে বাজছে—

*রাজার কান কাটা।

তাই নিলে কাক ব্যাটা।'

নাপিত কাঁপতে কাঁপতে বললে, 'দোহাই মহারাজ, একথা আমি কাউকে বলিনি, কেবল বনের ভিতর গাছকে বলেছি। তা নইলে হুজুর, পেটটা ফেটে মরে যেতুম! আর আমি মরে গেলে আপনার দাড়ি কে কামিয়ে দিত বলুন?'

রাজা বললেন, 'চল ব্যাটা গাছের কাছে।' বলে নাপিতকে নিয়ে রাজা মুড়ি-সুড়ি দিয়ে গাছের কাছে গেলেন।

নাপিত বললে, ‘গাছ আমি তোমায় কী বলেছি? সত্য কথা বলবে।'

গাছ বললে—

'রাজার কান কাটা।

তাই নিলে কাক ব্যাটা।'

রাজা বললেন, 'আর কারো কাছে নাপিত বলেছে কি?”

গাছ বললে, 'না।'

রাজা বললেন, 'তবে ঢুলি জানলে কেমন করে ?”

গাছ বললে, 'আমার ডাল কেটে ঢুলি ঢোল করেছে তাই ঢোলে বাজছে—রাজার কান কাটা। আমি তাকে অনেকবার ডাল কাটতে বারণ করেছিলাম কিন্তু সে শোনেনি।'

রাজা বললেন, ‘গাছ এ দোষ তোমার। আমি তোমায় কেটে উনুনে পোড়াবো।'

গাছ বললে, 'মহারাজ' এমন কাজ করো না। যেই ঢুলি আমার ডাল কেটেছে আমি তাকে শাস্তি দেবী তুমি কাল সকালে তাকে আমার কাছে ধরে নিয়ে এস।'

রাজা বললেন, 'আমার কাটা কানের কথা প্রকাশ হল তার উপায় ?

প্রজারা যে আমার রাজত্ব কেড়ে নেবে।'

গাছ বললে, ‘তোমার সে ভয় নেই, আমি কাল তোমার কাটা কান ঘোড়া দেব।' শুনে রাজা খুশি হয়ে রাজ্যে ফিরলেন। রাজা ফিরে আসতেই রাজার রানী, রাজার মন্ত্রী, রাজার যত প্রজা রাজাকে ঘিরে বললে, 'রাজামশাই তোমার কান দেখি।'

রাজা দেখালেন—এক কান কাটা। তখন কেউ বললে, ‘ছি ছি, কেউ বললে, ‘হায় হায়’, কেউ বললে, 'এমন রাজার প্রজা হবো না।' তখন রাজা বললেন, 'বাছারা কাল আমার কাটা কান জোড়া যাবে। তোমরা এখন সেই ঢুলিকে বন্দী কর। কাল সকালে তাকে নিয়ে বনে যে অশ্বত্থ গাছ আছে তারই তলায় যেও!'

রাজার কথা শুনে প্রজারা ঢুলিকে বন্দী করার জন্য ছুটল।

তার পরদিন সকালে রাজা, মন্ত্রী, নাপিত, রাজ্যের যত প্রজা সেই ঢুলিকে নিয়ে ধূমধাম করে সেই অশ্বত্থ তলায় হাজির হলেন।

রাজা বললেন, ‘অশ্বত্থ ঠাকুর ঢুলির বিচার করো।'

অশ্বত্থ ঠাকুর নাপিতকে বললেন, ‘নাপিত, ঢুলির একটা কান কেটে রাজার কানে জুড়ে দাও।' নাপিত ঢুলির একটা কান কেটে রাজার কানে জুড়ে দিল।

চারদিকে ঢাক-ঢোল বেজে উঠল রাজার কান জোড়া লেগে গেল। এমন সময় যে হনুমান রাজার কান ছিঁড়েছিল সে এসে বললে, ‘অশ্বত্থ ঠাকুর বিচার করো, রাজামশায় আমার কান কেটেছে, আমার কান চাই।'

অশ্বত্থ ঠাকুর বললেন, 'রাজা, ঢুলির অন্য কান কেটে হনুকে দাও।

একটা কান কাটা থাকলে বেচারির বড় অসুবিধা হত—দেশের বাইরে দিয়ে যেতে হত। এইবার ঢুলির দু'কান কাটা হল। সে এখন দেশের ভিতর দিয়ে যেতে পারবে।'

রাজা এক কোপে ঢুলির আর এক কান কেটে হনুর কান জুড়ে দিলেন।

তখন অশ্বত্থ ঠাকুর বললেন, 'ঢুলি এইবার ঢোল বাজাও।'

ঢুলি লজ্জায় ঘাড় হেঁট করে ঢোল বাজাতে লাগলো-ঢোল বাজছে টুলির কান কাটা। ঢুলির কান কাটা।'-

রাজা ফুল-চন্দনে অশ্বত্থ ঠাকুরের পুজো দিয়ে ঘরে ফিরলেন। রানী, রাজার কান দেখে বললেন, 'একটি কান কিন্তু কালো হল।’

রাজা বললেন, তা হোক, কাটা কানের চেয়ে কালো কান ভাল। নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল।