ভিয়েনা সম্মেলনের কার্যাবলীর একটি সমালোচনা মূলক মূল্যায়ন কর
![]() |
প্রশ্ন : ভিয়েনা সম্মেলনের কার্যাবলির একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন করো।
উত্তর> ভূমিকা : নেপোলিয়নের পতনের পর বিজয় দেশগুলি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেন যা ভিয়েনা সম্মেলন নামে পরিচিত।
উদ্দেশ্য : এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল—(১) ইউরোপের তীব্র অস্থিরতা দূর করে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি প্রতিষ্ঠা করা,
(২) ইউরোপের পুনর্গঠন ও পুনর্বণ্টন করা। সম্মেলনের নেতারা ন্যায়, সততা প্রভৃতি উচ্চ আদর্শের কথা প্রকাশ্যে বললেও তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল—(১) বিপ্লব (ফরাসি) প্রসূত ভাবধারা দমন করা এবং (২) ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল নিজেদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া।
নীতিসমূহ : নিজেদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে এবং শক্তিসাম্যের দিকে লক্ষ রেখে এই সম্মেলনে মূলত তিনটি নীতি অনুসরণ করা হয়; সেগুলি হল – (১) ন্যায্য অধিকার নীতি,
(২) ক্ষতিপূরণ নীতি ও (৩) শক্তিসাম্য নীতি।
কার্যাবলি : ন্যায় অধিকার নীতি অনুসারে ফরাসি বিপ্লবের আগেকার বিভিন্ন রাজা বা রাজবংশকে তাঁদের নিজের দেশে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, প্রাশিয়া প্রভৃতি দেশ কিছু কিছু ভূখণ্ড নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে
ক্ষতিপূরণ করে। ফ্রান্সকে প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে শক্তির সমতা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
★ ভিয়েনা-সম্মেলনের সমালোচনা : আধুনিক ইউরোপের কূটনীতির ইতিহাসে ভিয়েনা কংগ্রেস একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলেও সম্মেলনের কাজকর্ম নানাভাবে সমালোচিত হয়েছিল
[১] প্রকৃত সম্মেলন নয় : ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ অংশগ্রহণ করলেও ইংল্যান্ড, রাশিয়া, প্রাশিয়া অস্ট্রিয়া ও ফ্রান্স এই পাঁচটি শক্তি মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। সব সিদ্ধান্ত আগে থেকেই গোপন বৈঠক করে ঠিক করে রাখা হত। ফলে যোগদানকারী অন্যান্য দেশগুলির কোনো ভূমিকাই ছিল না। স্বাভাবিক কারণেই এই সম্মেলনকে প্রকৃত সম্মেলন বলা যায় না।
[২] নীতি প্রয়োগের ত্রুটি : ভিয়েনা কংগ্রেসের নেতারা যে-তিনটি নীতি (ন্যায্য অধিকার, ক্ষতিপূরণ, শক্তিসাম্য) প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন তা বাস্তব ক্ষেত্রে সব জায়গায় সমানভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়নি, অর্থাৎ নিজেদের তৈরি করা নীতি নিজেরাই মেনে চলেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইটালির ভেনিসে আগের মতো প্রজাতন্ত্র ফেরানো হয়নি।
৩. গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ধ্বংসসাধন : ফরাসি বিপ্লব ইউরোপের দেশগুলিতে যে-জাতীয়তাবাদের জোয়ার এনেছিল, ভিয়েনা চুক্তি প্রণেতারা তা অবজ্ঞা করেছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে গণতন্ত্র, উদারতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ধ্বংসসাধন করেছিল। উদাহরণ হিসেবে জার্মানি ও ইটালির কথা বলা যায়।
৪ নিমর্মতা : ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্যোক্তারা নতুন নতুন ভূখণ্ড লাভের জন্য এতটাই লালায়িত ছিল তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তিগুলির সম্পত্তি অধিকার করতে একটুও পিছুপা হয়নি।
৫ নিজেদের স্বার্থরক্ষা : সম্মেলনের কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থরক্ষা করা এবং গোপন চুক্তি কার্যকরী করাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।
৬. প্রতিক্রিয়াশীল : ভিয়েনা সম্মেলনের কর্ণধাররা সকলেই ছিলেন রাজতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারে বিশ্বাসী ও প্রতিক্রিয়াশীল
রাজনীতিবিদ। ন্যায্য অধিকার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁরা ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের পূর্বের অবস্থাকেই ফিরিয়ে আনেন।
৭ অযৌক্তিক : ভিয়েনা-কংগ্রেস পোল্যান্ডবাসীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ না-করে পোল্যান্ড ব্যবচ্ছেদ এবং জাতি ধর্ম ঐতিহাসিক বিবর্তন উপেক্ষা করে বেলজিয়ামকে হল্যান্ডের অধীনে
স্থাপন—এই দুই ব্যবস্থাই ছিল অযৌক্তিক।
৮ অস্থায়িত্ব : ভিয়েনা সম্মেলনে যেসব চুক্তি ও ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
৯ সম্পদ ভাগ করে নেওয়া : ভিয়েনা সম্মেলনের নেতারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজেদের মধ্যে বিজিতদের সম্পদ ভাগ করে নিয়েছিলেন।
১০ কালের গতির বিরুদ্ধাচরণ : ভিয়েনা সম্মেলনের প্রতিনিধিরা বিপ্লবপ্রসূত নব আদর্শ ও পুরাতনতন্ত্রের সমন্বয়সাধন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে তাঁরা যুগধর্মকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন।
■ উপসংহার : ভিয়েনা চুক্তির বিপক্ষে যুক্তিগুলি স্বীকার করেও বলা যায়, এই চুক্তি দ্বারা ইউরোপে বহুদিন শাস্তি ও স্থিতি স্থাপিত হয়। ইউরোপে অন্তত ৪০ বছর শান্তি আসে।
