ফ্রান্সের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের গুরুত্ব কি ছিল ? এই বিপ্লবকে কি বিশ্ব বিপ্লবের সমতুল্য বিপ্লব বলা যায় ? নবম শ্রেণী ইতিহাস । তৃতীয় অধ্যায়
![]() |
প্রশ্ন: ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের গুরুত্ব কী ছিল? এই বিপ্লবকে কী বিশ্ববিপ্লবের সমতুল্য বিপ্লব বলা যায়?
উত্তর সংকেত : প্রথম অংশ : ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের গুরুত্ব : (১) রাজতন্ত্রের অবসান ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, (২) সর্বজনীন ভোটাধিকার নীতি, (৩) এককক্ষযুক্ত আইনসভা, (৪) জনসাধারণের প্রাধান্য স্থাপন, (৫) ফ্রান্সে দাসপ্রথার উচ্ছেদ, (৬) সামরিক বাহিনীর দ্বার উন্মুক্ত, (৭) সমাজতন্ত্র স্থাপনের চেষ্টা।
দ্বিতীয় অংশ : (১) ইউরোপেই সীমাবদ্ধ, (২) বিপ্লবের ব্যর্থতা, (৩) ভিন্নতা-মূল্যায়ন।
উত্তর>> প্রথম অংশ : ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে এই জুলাই রাজতন্ত্রের (১৮৩০–৪৮ খ্রিস্টাব্দ) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয় যা ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে পরিচিত।
◆ ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের গুরুত্ব : ফ্রান্সের ইতিহাসে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব ছিল এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, কারণ ফ্রান্সের ইতিহাসে এই বিপ্লবের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী-
[১] রাজতন্ত্রের অবসান ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা : এই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্সে জুলাই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং প্রজাতন্ত্রী নেতা লা মার্টিনের নেতৃত্বে এই অস্থায়ী প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।
[2] সর্বজনীন ভোটাধিকার নীতি : এই বিপ্লবের কুশীলবদের (থিয়ার্স, লা মার্টিন প্রমুখ) অন্যতম দাবি ছিল ভোটাধিকার সম্প্রসারণ এবং এ কারণে এই বিপ্লবের পরসর্বজনীন ভোটাধিকার স্বীকৃত হয়।
[৩] এক কক্ষ যুক্ত আইনসভা : অস্থায়ী সরকার প্রজাতান্ত্রিক ফ্রান্সের গঠনতন্ত্র তৈরি করে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে নির্বাচিত ৭৫০ জন সদস্যের এককক্ষযুক্ত একটি আইনসভা ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত চার বছরের জন্য একজন রাষ্ট্রপতির ব্যবস্থা করে।
[৪] জনসাধারণের প্রাধান্য স্থাপন : এই বিপ্লবের ফলে প্রথম মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রাধান্যের স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় জনসাধারণের রাজনৈতিক অধিকার ও সমতা; পাশাপাশি আর্থসামাজিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছিল।
[৫] ফ্রান্সে দাসপ্রথার উচ্ছেদ : ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর ফ্রান্সের প্রজাতান্ত্রিক সরকার দাসপ্রথার উচ্ছেদসাধন করে। এভাবে প্রায় ৫ লক্ষ দাসকে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার সুযোগ এনে দেয়।
[৬] সামরিক বাহিনীর দ্বার উন্মুক্ত : ফরাসি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার ফলে জাতীয় সামরিক বাহিনীতে যে-কোনো লোক যোগদান করতে পারবে বলে স্বীকৃত হয়।
[৭] সমাজতন্ত্র স্থাপনের চেষ্টা : সকলের জন্য আর্থিক আয়ের ব্যবস্থা করা, মজুরশ্রেণির স্বার্থরক্ষা এবং প্রজাতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তিতে স্থাপন করা, এইগুলি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের মূল উদ্দেশ্য বলে ঘোষিত হয়েছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সমাজতন্ত্রবাদ বা অর্থনৈতিক ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা স্থাপনের চেষ্টা সেসময় ফ্রান্সেই প্রথম দেখা যায়।
দ্বিতীয় অংশ : ঐতিহাসিক এরিক হবস্বম ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবকে বিশ্ববিপ্লবের সমতুল্য' বলে অভিহিত করেছেন। এই বিপ্লব ইউরোপের ভিয়েনা বন্দোবস্ত ও মেটারনিখতন্ত্রের পতন ঘটায়। এই বিপ্লবের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অস্ট্রিয়া, ইটালি, হাঙ্গেরি, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, মিলান, রোম, বোহেমিয়ায় একের পর এক বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হয়। এভাবে এই বিপ্লব ইউরোপের অন্তত ১৫টি দেশে
ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ঐতিহাসিক এরিক হবম-এর এই বক্তব্য পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য নয়, কারণ—
[১] ইউরোপেই সীমাবদ্ধ : ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ইউরোপেই সীমাবদ্ধ ছিল; এই বিপ্লবের প্রভাবে ইউরোপের বাইরে অন্য দেশে বিপ্লব সংঘটিত হয়নি।
[২] বিপ্লবের ব্যর্থতা : ইউরোপের ১৫টি দেশে এই বিপ্লব ছড়িয়ে পড়লেও খুব কম দেশেই তা সফল হয়েছিল। রাজতান্ত্রিক দেশগুলির দমনপীড়নে শেষপর্যন্ত বিপ্লব সফল হয়নি।
[৩] ভিন্নতা : কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে ইউরোপে সব জায়গায় ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব পরিব্যাপ্ত হয়নি, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এই বিপ্লবের প্রকৃতি ও গভীরতা ছিল আলাদা ধরনের।
◆ মূল্যায়ন : ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ব্যর্থতা সত্ত্বেও এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এই বিপ্লব ইউরোপের সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন এনেছিল। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে মহান ফরাসি বিপ্লব যার সুচনা করেছিল ফেব্রুয়ারি বিপ্লব তাকে পরিণত
করেছিল। তাই একে বিশ্ববিপ্লব বললেও অত্যুক্তি হবে না।
